এন্ডোমেট্রিয়াল হাইপারপ্লাসিয়া (Endometrial Hyperplasia) হলো জরায়ুর ভেতরের আস্তরণ বা এন্ডোমেট্রিয়াম স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পুরু হয়ে যাওয়ার একটি অবস্থা। এটি মূলত হরমোনের ভারসাম্যহীনতার (ইস্ট্রোজেন বৃদ্ধি এবং প্রোজেস্টেরন হ্রাস) কারণে ঘটে। চিকিৎসকদের মতে, এই অবস্থাটি গুরুতর বা ক্যান্সারে রূপ নেওয়ার অন্তত ৩ মাস আগে থেকে শরীর নির্দিষ্ট কিছু সংকেত দিতে শুরু করে।
এই লক্ষণগুলো শনাক্ত করতে পারলে ভবিষ্যৎ জটিলতা বা জরায়ু ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
হাইপারপ্লাসিয়া হঠাৎ করে হয় না; এর লক্ষণগুলো ক্রমান্বয়ে প্রকট হয়। সাধারণত ৩ মাস আগে থেকে নিম্নলিখিত ৫টি লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে:
১. মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত (Menorrhagia):
আপনার যদি আগে স্বাভাবিক রক্তপাত হতো, কিন্তু হঠাৎ করে দেখা যায় প্রতি ১-২ ঘণ্টা অন্তর প্যাড পরিবর্তন করতে হচ্ছে, তবে এটি প্রাথমিক লক্ষণ। জরায়ুর দেয়াল পুরু হয়ে যাওয়ার কারণে রক্তপাতের পরিমাণ এবং স্থায়িত্ব (৭ দিনের বেশি) অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
২. মাসিক চক্রের সময়সীমা কমে আসা:
যদি দেখেন আপনার মাসিক চক্র ২১ দিনের আগেই ফিরে আসছে, তবে এটি সতর্ক সংকেত। ঘন ঘন মাসিক হওয়া নির্দেশ করে যে জরায়ুর আস্তরণ খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তা অপরিপক্ক অবস্থায় ঝরে পড়ছে।
৩. দুই মাসিকের মধ্যবর্তী সময়ে রক্তপাত (Spotting):
মাসিক শেষ হওয়ার কয়েকদিন পর আবার হালকা রক্তপাত বা ‘স্পটিং’ হওয়া হাইপারপ্লাসিয়ার একটি অন্যতম লক্ষণ। ৩ মাস আগে থেকেই এটি অনিয়মিতভাবে দেখা দিতে পারে, যা অনেক সময় নারীরা অবহেলা করেন।
৪. অস্বাভাবিক সাদা স্রাব এবং দুর্গন্ধ:
জরায়ুর আস্তরণ যখন অতিরিক্ত ঘন হয়, তখন যোনিপথে জলের মতো বা কিছুটা হলদেটে স্রাবের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। অনেক সময় এই স্রাবের সাথে হালকা রক্তের আভা বা দুর্গন্ধ থাকতে পারে, যা জরায়ুর ভেতরের কোষীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
৫. তলপেটে একটানা ভারি ভাব ও পেলভিক পেইন:
মাসিক ছাড়াও সারা মাস জুড়ে তলপেটে এক ধরণের অস্বস্তি বা চাপ অনুভব করা। জরায়ুর আকার সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে বা আস্তরণ পুরু হওয়ার কারণে পেলভিক অঞ্চলে রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে একটানা হালকা ব্যথা অনুভূত হয়।
কেন ৩ মাস আগের এই লক্ষণগুলো গুরুত্বপূর্ণ?
এন্ডোমেট্রিয়াল হাইপারপ্লাসিয়া সরাসরি ক্যান্সার নয়, তবে এটি ‘প্রিক্যান্সারাস’ বা ক্যান্সারের পূর্বাবস্থা হতে পারে। বিশেষ করে অ্যাটিপিকাল হাইপারপ্লাসিয়া থাকলে জরায়ু ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রায় ৩০% বেড়ে যায়। ৩ মাস আগে যখন এই ৫টি লক্ষণ দেখা দেয়, তখন শরীরের হরমোন লেভেল নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে বা বায়োপসি করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিলে অপারেশন ছাড়াই রোগ নিরাময় সম্ভব।
প্রতিরোধে আপনার করণীয়
-
ওজন নিয়ন্ত্রণ: শরীরের অতিরিক্ত মেদ ইস্ট্রোজেন হরমোন বাড়িয়ে দেয়, যা জরায়ুর দেয়াল পুরু করার প্রধান কারণ।
-
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস হাইপারপ্লাসিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
-
হরমোন থেরাপি: যারা মেনোপজের পর শুধু ইস্ট্রোজেন গ্রহণ করছেন, তাদের অবশ্যই প্রোজেস্টেরনও সাথে রাখা উচিত (চিকিৎসকের পরামর্শে)।
কখন দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন?
যদি মেনোপজ (মাসিক চিরতরে বন্ধ হওয়া) হয়ে যাওয়ার পর সামান্যতম রক্তপাতও দেখেন, তবে একদিনও দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এছাড়া উপরোক্ত ৫টি লক্ষণ যদি টানা দুই বা তিন মাস ধরে চলতে থাকে, তবে আল্ট্রাসনোগ্রাম (TVS) এবং জরায়ুর লাইনিংয়ের পুরুত্ব (Endometrial Thickness) পরীক্ষা করা জরুরি।
