গর্ভকালীন জটিল জন্মগত রোগগুলোর মধ্যে অন্যতম বিরল ও মারাত্মক একটি হলো প্যাটাউ সিন্ড্রোম বা ট্রাইসোমি ১৩। এ রোগে শিশুর ১৩ নম্বর ক্রোমোজোমের অতিরিক্ত কপি থাকে, ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। চিকিৎসকদের মতে, এটি শুধু জন্মের পর নয়—গর্ভাবস্থার প্রথম দিক থেকেই মায়ের শরীর ও ভ্রূণের বিকাশে কিছু আগাম সংকেত দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে প্রসবের প্রায় এক বছর আগেই (গর্ভধারণের প্রথম ও মধ্য পর্যায়ে) সতর্কতা লক্ষ করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করতে পারলে পরিবার প্রস্তুতি নিতে পারে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা জেনেটিক কাউন্সেলিং নেওয়া সহজ হয়।
নিচে তুলে ধরা হলো প্যাটাউ সিন্ড্রোমের ৬টি আগাম লক্ষণ ও সতর্ক সংকেত—
১. অস্বাভাবিক আল্ট্রাসাউন্ড রিপোর্ট
গর্ভের ১২–২০ সপ্তাহে আল্ট্রাসাউন্ডে শিশুর মাথা, মুখমণ্ডল বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে গঠনগত ত্রুটি ধরা পড়তে পারে। যেমন—ঠোঁট কাটা, তালু ফাটা, ছোট মাথা (মাইক্রোসেফালি) বা অতিরিক্ত আঙুল। এগুলো ট্রাইসোমি ১৩-এর বড় ইঙ্গিত।
২. ভ্রূণের বৃদ্ধি ধীরগতির হওয়া
সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ে শিশুর ওজন ও আকার বাড়ার কথা। কিন্তু প্যাটাউ সিন্ড্রোমে আক্রান্ত ভ্রূণ স্বাভাবিকের তুলনায় ছোট থাকে বা ওজন কম বাড়ে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে Intrauterine Growth Restriction (IUGR) বলা হয়।
৩. মায়ের রক্ত পরীক্ষায় অস্বাভাবিক ফল
ডাবল মার্কার, ট্রিপল টেস্ট বা NIPT (Non-Invasive Prenatal Testing) পরীক্ষায় ক্রোমোজোমের অস্বাভাবিকতা ধরা পড়তে পারে। এই পরীক্ষাগুলো আগাম ঝুঁকি নির্ণয়ে কার্যকর।
৪. শিশুর হৃদযন্ত্রের সমস্যা
ইকোকার্ডিওগ্রামে ভ্রূণের হার্টের গঠনগত ত্রুটি ধরা পড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। প্যাটাউ সিন্ড্রোমে জন্মগত হৃদরোগ খুব সাধারণ।
৫. অতিরিক্ত অ্যামনিওটিক ফ্লুইড (Polyhydramnios)
মায়ের পেটে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পানি জমলে তা ভ্রূণের গিলতে বা শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। এটি অনেক সময় জেনেটিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
৬. গর্ভপাত বা মৃতভ্রূণের ইতিহাস
বারবার গর্ভপাত বা পূর্বে অস্বাভাবিক শিশুর জন্ম থাকলে জেনেটিক ত্রুটির ঝুঁকি বেশি থাকে। চিকিৎসকেরা একে সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচনা করেন।
কেন আগাম পরীক্ষা জরুরি?
গাইনোকোলজিস্ট ও জেনেটিক বিশেষজ্ঞদের মতে—
- আগেভাগে শনাক্ত হলে পরিবার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে
- জেনেটিক কাউন্সেলিং ও মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হয়
- বিশেষায়িত হাসপাতাল বা নবজাতক নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা রাখা যায়
প্যাটাউ সিন্ড্রোম কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি ১০–১৫ হাজার জন্মে একটি শিশু এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। আক্রান্ত অনেক শিশু জন্মের পর দীর্ঘদিন বাঁচে না। তবে আধুনিক চিকিৎসায় কিছু ক্ষেত্রে বেঁচে থাকার হার বাড়ছে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
- ৩৫ বছরের বেশি বয়সে গর্ভধারণ
- পরিবারে জেনেটিক রোগের ইতিহাস
- পূর্বে ক্রোমোজোমজনিত সমস্যা
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
চিকিৎসকেরা বলছেন, “গর্ভাবস্থায় নিয়মিত আল্ট্রাসাউন্ড ও স্ক্রিনিং টেস্ট এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। সামান্য অস্বাভাবিকতাও গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করানো দরকার।”
