x
d o c t o r s 2 4
ফুসফুসের অদৃশ্য ঘাতক মাইকোব্যাকটেরিয়াম থেকে বাঁচার উপায়
16 Feb

আমাদের চারপাশে অদৃশ্য অসংখ্য জীবাণুর মধ্যে ‘মাইকোব্যাকটেরিয়াম’ (Mycobacterium) এক অত্যন্ত জটিল এবং জেদি শ্রেণির ব্যাকটেরিয়া। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো Mycobacterium tuberculosis, যা যক্ষ্মা বা টিবি (TB) সৃষ্টি করে। তবে বর্তমানে চিকিৎসকদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘নন-টিউবারকুলাস মাইকোব্যাকটেরিয়া’ (NTM), যা সাধারণ যক্ষ্মা না হয়েও ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। এই সংক্রমণগুলো একবার শরীরে শিকড় গাড়লে তা নির্মূল করা বেশ সময়সাপেক্ষ।

নিচে মাইকোব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের লক্ষণ, ফুসফুসের জটিলতা এবং আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. সংক্রমণের ধরন ও উৎস

মাইকোব্যাকটেরিয়াম মূলত মাটি, পানি এবং ধূলিকণায় বাস করে। আমরা যখন শ্বাস নেই বা দূষিত পানির বাষ্প আমাদের ফুসফুসে প্রবেশ করে, তখন এই ব্যাকটেরিয়া ফুসফুসের টিস্যুতে আক্রমণ করে। যক্ষ্মা ব্যাকটেরিয়া একজন থেকে অন্যজনে ছড়ালেও, NTM সাধারণত পরিবেশ থেকে সরাসরি মানুষের ফুসফুসে আসে। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই অ্যাজমা বা ব্রঙ্কিয়েক্ট্যাসিস (Bronchiectasis) আছে, তারা এই ঝুঁকির শীর্ষে থাকেন।

২. ফুসফুসে যে ধরণের সমস্যা তৈরি হয়

মাইকোব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন ফুসফুসে মূলত ‘ক্যাভিটেশন’ বা ছোট ছোট গহ্বর তৈরি করে। এটি ফুসফুসের স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট করে দেয়, যার ফলে ফুসফুস অক্সিজেন ঠিকমতো গ্রহণ করতে পারে না। দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের ফলে ফুসফুসে ক্ষত চিহ্ন (Scarring) পড়ে যায়, যা পরবর্তীকালে স্থায়ী শ্বাসকষ্টের কারণ হয়।

শনাক্তকরণের ৫টি প্রধান লক্ষণ

মাইকোব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন খুব ধীরে ধীরে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এর লক্ষণগুলো হলো:

  • টানা ৩ সপ্তাহের বেশি কাশি: সাধারণত শুকনো কাশি হয়, তবে সংক্রমণ বাড়লে কফ বা রক্তও আসতে পারে।

  • বিকেলের দিকে জ্বর: প্রতিদিন বিকেলের দিকে শরীর হালকা গরম হওয়া এবং রাতে প্রচুর ঘাম হওয়া।

  • তীব্র শ্বাসকষ্ট: সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় বা সামান্য পরিশ্রমে দম ফুরিয়ে আসা।

  • বুকে ব্যথা ও অস্বস্তি: দীর্ঘদিনের কাশির ফলে বুকের পেশি ও ফুসফুসের আবরণে ব্যথা অনুভূত হওয়া।

  • অব্যক্ত ওজন হ্রাস: কোনো চেষ্টা ছাড়াই দ্রুত ওজন কমে যাওয়া এবং চরম অবসাদ।

আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি

মাইকোব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের চিকিৎসা সাধারণ ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের মতো ৫-৭ দিনের নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া:

  • মাল্টি-ড্রাগ থেরাপি: যক্ষ্মার ক্ষেত্রে সাধারণত ৬ মাসের কোর্স দেওয়া হয়। তবে NTM-এর ক্ষেত্রে ১২ থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের সংমিশ্রণ সেবন করতে হতে পারে।

  • অ্যান্টিবায়োটিক ইনহেলেশন: বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ইনহেলার বা নেবুলাইজারের মাধ্যমে সরাসরি ফুসফুসে ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমায়।

  • ইমিউনোথেরাপি: যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে ইমিউনিটি বাড়ানোর চিকিৎসা দেওয়া হয় যাতে শরীর নিজে থেকেই ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়তে পারে।

  • অপারেশন বা সার্জারি: যদি ফুসফুসের কোনো একটি অংশ খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেখানে ওষুধ কাজ না করে, তবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেই অংশটি বাদ দেওয়া হতে পারে।

প্রতিরোধ ও রোগীর জীবনযাত্রা

মাইকোব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন থেকে দূরে থাকতে এবং দ্রুত সুস্থ হতে কিছু বিশেষ নিয়ম মানা জরুরি:

  • বাষ্প বা ভ্যাপার এড়িয়ে চলা: শাওয়ার বা হট টাব থেকে ওঠা গরম পানির বাষ্পে এই ব্যাকটেরিয়া বেশি থাকে। বাথরুমে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন রাখুন।

  • পুষ্টিকর খাবার: উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবার যেমন—ডিম, দুধ, বাদাম এবং প্রচুর শাকসবজি খান যা টিস্যু মেরামতে সাহায্য করে।

  • মাস্ক ব্যবহার: ধুলোবালি বা নির্মাণাধীন এলাকায় চলাচলের সময় অবশ্যই উন্নত মানের মাস্ক ব্যবহার করুন।

  • নিয়মিত ফুসফুসের ব্যায়াম: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ‘ব্রিদিং এক্সারসাইজ’ করলে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়ে।

যক্ষ্মা বা অন্য যে কোনো মাইকোব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের ওষুধ মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। এতে ব্যাকটেরিয়াগুলো ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা (Drug Resistance) গড়ে তোলে, যা পরবর্তীতে নিরাময় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

Leave A Comment