ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস (DKA) হলো ডায়াবেটিসের এমন একটি জটিলতা যা অত্যন্ত দ্রুত এবং ভয়াবহভাবে শরীরে দানা বাঁধতে পারে। এটি মূলত টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা দিলেও ইনসুলিন-নির্ভর টাইপ-২ রোগীদের ক্ষেত্রেও এটি প্রাণঘাতী হতে পারে। শরীরে ইনসুলিনের চরম অভাব দেখা দিলে কোষগুলো শক্তির জন্য গ্লুকোজ ব্যবহার করতে পারে না, ফলে শরীর চর্বি বা ফ্যাট ভাঙতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়ায় রক্তে ‘কিটোন’ নামক এক প্রকার অ্যাসিড তৈরি হয়, যা রক্তকে বিষাক্ত বা আম্লিক করে তোলে।
গবেষণায় দেখা গেছে, গুরুতর ডিকেএ আক্রান্ত হওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টা বা ১ দিন আগে থেকেই শরীর কিছু সতর্কতামূলক সংকেত দিতে শুরু করে। এই ৫টি প্রাথমিক লক্ষণ জানা থাকলে বড় ধরনের বিপদ এড়ানো সম্ভব।
বিপৎসংকেত: ডিকেএ-র চূড়ান্ত পর্যায়ের ১ দিন আগের ৫টি লক্ষণ
১. অতিরিক্ত তৃষ্ণা ও শুষ্ক মুখ (Extreme Thirst)
রক্তে শর্করার মাত্রা যখন ৩০০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার ছাড়িয়ে যেতে শুরু করে, শরীর তখন প্রস্রাবের মাধ্যমে সেই শর্করা বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে। এর ফলে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হয়। আপনি যদি দেখেন ১ দিন ধরে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি পানি পান করার পরও আপনার মুখ বারবার শুকিয়ে যাচ্ছে এবং তৃষ্ণা মিটছে না, তবে এটি ডিকেএ-র প্রথম ধাপ হতে পারে।
২. অস্বাভাবিক ঘনঘন প্রস্রাব (Frequent Urination)
তৃষ্ণার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে প্রস্রাবের পরিমাণ। বিশেষ করে রাতে বারবার প্রস্রাবের চাপে ঘুম ভেঙে যাওয়া এবং প্রস্রাবের পরিমাণ অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া নির্দেশ করে যে শরীরে ইনসুলিন কাজ করছে না। ডিকেএ-র ১ দিন আগে এই লক্ষণটি সবথেকে স্পষ্টভাবে দেখা দেয়।
৩. তীব্র মাথাব্যথা এবং ক্লান্তি
শরীর যখন গ্লুকোজ থেকে শক্তি পায় না এবং কিটোন জমতে শুরু করে, তখন মস্তিষ্কে এর প্রভাব পড়ে। কোনো কারণ ছাড়াই প্রচণ্ড মাথাব্যথা এবং সারা শরীরে চরম অবসাদ বা ক্লান্তি অনুভব হওয়া ডিকেএ-র একটি প্রধান সংকেত। রোগী এই সময়ে হাত-পা নাড়াতেও কষ্ট অনুভব করতে পারেন।
৪. বমি বমি ভাব এবং পেটে অস্বস্তি
রক্তে কিটোনের মাত্রা বাড়তে থাকলে তা পাকস্থলী ও অন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। ডিকেএ-র পূর্ণ বিকাশের ২৪ ঘণ্টা আগে থেকেই রোগীর মধ্যে হালকা থেকে মাঝারি বমি বমি ভাব (Nausea) দেখা দিতে পারে। অনেক সময় পেটের ওপরের দিকে হালকা মোচড় দেওয়া ব্যথা অনুভূত হয়, যা অনেকেই সাধারণ গ্যাস বা হজমের সমস্যা মনে করে ভুল করেন।
৫. ফ্লাশড স্কিন বা ত্বক লালচে হয়ে যাওয়া
শরীরের রাসায়নিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ায় এবং কিটোন শরীর থেকে বের করার চেষ্টায় রক্ত চলাচলের ধরনে পরিবর্তন আসে। এর ফলে ডিকেএ শুরুর ১ দিন আগে থেকেই রোগীর মুখমণ্ডল বা ত্বক অস্বাভাবিক লালচে (Flushed) এবং গরম হয়ে উঠতে পারে। যদিও মনে হতে পারে জ্বর আসছে, কিন্তু থার্মোমিটারে তাপমাত্রা নাও থাকতে পারে।
জরুরি অবস্থায় আপনার করণীয়
যদি ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে ওপরের লক্ষণগুলো ১ দিন ধরে চলতে থাকে, তবে দেরি না করে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া উচিত:
-
গ্লুকোমিটার দিয়ে সুগার চেক করুন: যদি শর্করার মাত্রা ২৫০-৩০০ mg/dL-এর বেশি থাকে, তবে সতর্ক হোন।
-
কিটোন স্ট্রিপ ব্যবহার করুন: ঘরে কিটোন পরীক্ষার স্ট্রিপ থাকলে প্রস্রাব বা রক্তে কিটোনের উপস্থিতি পরীক্ষা করুন।
-
প্রচুর পানি পান করুন: চিনিহীন তরল বা পানি পান করে শরীরকে হাইড্রেটেড রাখার চেষ্টা করুন।
-
চিকিৎসকের পরামর্শ: যদি বমি শুরু হয়ে যায় বা নিঃশ্বাসে ফলের মতো গন্ধ (Fruity breath) পাওয়া যায়, তবে এটি একটি ইমার্জেন্সি। অবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।
