নিয়মিত সর্দি-কাশি, হজমের সমস্যা বা অ্যালার্জি—এসবকে আমরা সাধারণ অসুখ ভেবেই এড়িয়ে যাই। কিন্তু কখনও কখনও এই উপসর্গগুলো হতে পারে শরীরের গভীরতর রোগপ্রতিরোধ ঘাটতির ইঙ্গিত। এমনই একটি নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো Selective IgA Deficiency বা সিলেকটিভ আইজিএ ডেফিসিয়েন্সি। বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগটি শনাক্ত হওয়ার প্রায় এক বছর আগে শরীরে কিছু সতর্ক সংকেত দেখা দিতে পারে।
সিলেকটিভ আইজিএ ডেফিসিয়েন্সি কী?
আমাদের শরীরে ইমিউনোগ্লোবুলিন এ (IgA) এক ধরনের অ্যান্টিবডি, যা মূলত শ্বাসতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র ও মিউকাস ঝিল্লিকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। সিলেকটিভ আইজিএ ডেফিসিয়েন্সিতে রক্তে IgA-এর মাত্রা খুব কম বা অনুপস্থিত থাকে, কিন্তু অন্যান্য অ্যান্টিবডি স্বাভাবিক থাকে। এটি বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে সাধারণ প্রাইমারি ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি হলেও অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন ধরা পড়ে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে জেনেটিক কারণ বা ইমিউন সিস্টেমের বিকাশজনিত সমস্যার কারণে এ অবস্থা তৈরি হয়। আবার কারও ক্ষেত্রে এটি অটোইমিউন রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
রোগ ধরা পড়ার ১ বছর আগে যে ৫টি লক্ষণ দেখা দিতে পারে
১. ঘন ঘন সাইনাস ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ
প্রায়ই সাইনাস ইনফেকশন, ব্রঙ্কাইটিস বা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়া একটি বড় সতর্ক সংকেত। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক নেওয়ার পরও বারবার সংক্রমণ ফিরে এলে ইমিউন সিস্টেম পরীক্ষা করা জরুরি।
২. দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া বা হজমের সমস্যা
পরিপাকতন্ত্রে IgA গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই ঘন ঘন পাতলা পায়খানা, পেট ফাঁপা বা অপুষ্টি দেখা দিতে পারে। অনেক সময় এটি Celiac disease-এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, যা আইজিএ ডেফিসিয়েন্সি রোগীদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
৩. অ্যালার্জি ও হাঁপানির প্রবণতা
ত্বকের র্যাশ, একজিমা বা অ্যালার্জিক রাইনাইটিসের মতো সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে সেটিও একটি আগাম সংকেত হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই রোগীদের মধ্যে অ্যালার্জি ও হাঁপানির হার তুলনামূলক বেশি।
৪. অটোইমিউন রোগের লক্ষণ
হঠাৎ করে জয়েন্টে ব্যথা, থাইরয়েডের সমস্যা বা রক্তশূন্যতার মতো উপসর্গ দেখা দিলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। আইজিএ ডেফিসিয়েন্সির সঙ্গে কিছু অটোইমিউন রোগের সম্পর্ক রয়েছে।
৫. রক্ত সঞ্চালনের পর অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া
অনেক ক্ষেত্রে রক্ত বা প্লাজমা নেওয়ার পর অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। কারণ শরীরে IgA না থাকায় বাইরের IgA-কে শরীর ‘বিদেশি’ হিসেবে শনাক্ত করে প্রতিক্রিয়া দেখায়।
কেন আগেভাগে শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ?
সিলেকটিভ আইজিএ ডেফিসিয়েন্সির নির্দিষ্ট কোনো নিরাময় নেই, তবে আগেভাগে শনাক্ত করলে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও জটিলতা কমানো সম্ভব। একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে IgA-এর মাত্রা পরিমাপ করা যায়। যেসব শিশু বা প্রাপ্তবয়স্ক বারবার সংক্রমণে ভোগেন, তাদের ক্ষেত্রে ইমিউন প্রোফাইল টেস্ট করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক রোগী বছরের পর বছর শুধু উপসর্গের চিকিৎসা নেন, কিন্তু মূল কারণ ধরা পড়ে না। ফলে সংক্রমণ ও অটোইমিউন জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে থাকে।
চিকিৎসা ও জীবনযাপন
এই রোগে সাধারণত নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবস্থাপনা, টিকাদান এবং সংক্রমণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ ভ্যাকসিন দেওয়া হয় সংক্রমণ কমাতে। পাশাপাশি—
- পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস
- হাত ধোয়ার অভ্যাস
- অ্যালার্জি নিয়ন্ত্রণ
- নিয়মিত চিকিৎসকের ফলোআপ
এসব ব্যবস্থা রোগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
সচেতনতা বাড়ানোই মূল চাবিকাঠি
বাংলাদেশে ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি সম্পর্কে সচেতনতা এখনও সীমিত। ফলে অনেক রোগী দেরিতে শনাক্ত হন। ঘন ঘন সংক্রমণ বা অস্বাভাবিক অ্যালার্জি থাকলে অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
