ভিটামিন B5, যার বৈজ্ঞানিক নাম প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড (Pantothenic Acid), গ্রিক শব্দ ‘প্যান্টোথেন’ থেকে এসেছে যার অর্থ ‘সর্বত্র’। এটি প্রায় সব খাবারেই কমবেশি থাকে বলে এর অভাব সচরাচর দেখা যায় না।
তবে আধুনিক প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে বর্তমানে অনেকের শরীরেই এই গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিনের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। এটি মূলত আমাদের শরীরকে স্ট্রেস বা মানসিক চাপের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং খাবার থেকে শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করে।
আমাদের শরীরের ‘অ্যাড্রিনাল গ্ল্যান্ড’ বা স্ট্রেস হরমোন নিয়ন্ত্রণকারী গ্রন্থিকে সচল রাখতে ভিটামিন B5-এর ভূমিকা অনন্য। যখনই এই ভিটামিনের মাত্রা কমতে শুরু করে, তখন শরীর তার স্বাভাবিক ভারসাম্য হারায়।
চিকিৎসকদের মতে, ভিটামিন B5-এর ঘাটতি পূর্ণ মাত্রায় পৌঁছানোর প্রায় ৩০ দিন বা ১ মাস আগে থেকেই শরীর অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট কিছু সংকেত পাঠাতে শুরু করে। এই লক্ষণগুলো শনাক্ত করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্ণতা বা হরমোনাল ইমব্যালেন্স এড়ানো সম্ভব।
নিচে সেই ৬টি প্রাথমিক লক্ষণ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. পায়ের পাতায় জ্বলুনি অনুভব (Burning Feet Syndrome)
ভিটামিন B5-এর অভাবের সবচেয়ে ক্লাসিক বা পরিচিত লক্ষণ হলো পায়ের পাতায় অস্বাভাবিক গরম ভাব বা জ্বলুনি। ১ মাস আগে থেকেই আপনি অনুভব করতে পারেন যে রাতে ঘুমানোর সময় পায়ের পাতা কামড়াচ্ছে বা আগুনের মতো গরম লাগছে। প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড স্নায়ুর প্রান্তভাগকে সুস্থ রাখে; এর অভাবে স্নায়ুগুলো উত্তেজিত হয়ে এই জ্বলুনির সৃষ্টি করে।
২. অস্বাভাবিক এবং দ্রুত ক্লান্তি (Extreme Fatigue)
যেহেতু ভিটামিন B2, B3 এবং B5 মিলে খাবার থেকে এটিপি (ATP) বা শক্তি তৈরি করে, তাই B5-এর অভাব হলে শরীর পর্যাপ্ত জ্বালানি পায় না। ১ মাস আগে থেকেই আপনি লক্ষ্য করবেন যে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে বা সাধারণ ঘরের কাজ করতে গিয়ে আপনি ভীষণ হাঁপিয়ে উঠছেন। এই ক্লান্তিটি কেবল শারীরিক নয়, বরং কোষীয় পর্যায়ের দুর্বলতা।
৩. অনিদ্রা এবং ঘুমের মান কমে যাওয়া (Insomnia)
প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড আমাদের শরীরে মেলাটোনিন ও কর্টিসল হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করে। এর ঘাটতি শুরু হলে রাতে সহজে ঘুম আসতে চায় না অথবা ঘুমের মাঝে বারবার ভেঙে যায়। যদি গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আপনার ঘুমের রুটিন এলোমেলো হয়ে যায়, তবে এটি এই ভিটামিনের অভাবের একটি নীরব সংকেত।
৪. খিটখিটে মেজাজ এবং মানসিক অস্থিরতা (Irritability)
ভিটামিন B5-কে ‘অ্যান্টি-স্ট্রেস’ ভিটামিন বলা হয়। যখন এর সরবরাহ কমে যায়, তখন সামান্য বিষয়ে মেজাজ বিগড়ে যাওয়া বা অকারণে উদ্বেগ (Anxiety) বোধ হতে পারে। ১ মাস আগে থেকেই আপনি যদি নিজেকে মানসিকভাবে অস্থিতিশীল মনে করেন, তবে এটি পুষ্টির অভাবের কারণে হতে পারে।
৫. পেশির খিঁচুনি ও অসাড়তা (Muscle Cramps and Numbness)
স্নায়ু থেকে পেশিতে সংকেত পৌঁছানোর জন্য অ্যাসিটাইলকোলিন (Acetylcholine) নামক একটি রাসায়নিক প্রয়োজন, যা তৈরিতে ভিটামিন B5 সরাসরি কাজ করে। এর অভাব শুরু হলে হাত বা পায়ের পেশিতে হুটহাট খিঁচুনি লাগতে পারে অথবা হাত-পা হঠাত অবশ বা অসাড় মনে হতে পারে।
৬. হজমের সমস্যা ও পেট ব্যথা (Digestive Distress)
ভিটামিন B5 আমাদের পাচনতন্ত্রের পেশিগুলোকে সচল রাখে। ১ মাস আগে থেকেই বমি বমি ভাব, পেট ফাঁপা বা মৃদু পেট ব্যথা শুরু হতে পারে। এটি অনেক সময় সাধারণ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা ভেবে ভুল করা হয়, যা আসলে ভিটামিনের অভাবের বহিঃপ্রকাশ।
কেন প্রক্রিয়াজাত খাবারে ঝুঁকি বেশি?
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, চাল বা আটা যখন অতিরিক্ত পালিশ বা রিফাইন করা হয়, তখন তার প্রায় ৮০% ভিটামিন B5 নষ্ট হয়ে যায়। তাই যারা সাদা চাল বা ময়দার তৈরি খাবার বেশি খান, তাদের এই ঘাটতি হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদী অ্যান্টিবায়োটিক সেবনও অন্ত্রে এই ভিটামিনের শোষণ কমিয়ে দেয়।
ঘাটতি মেটাতে সেরা ৫টি খাবার
ভিটামিন B5-এর অভাব দূর করা বেশ সহজ যদি প্রতিদিনের মেনুতে নিচের খাবারগুলো থাকে:
-
মাশরুম: এটি প্যান্টোথেনিক অ্যাসিডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎস।
-
ডিম: কুসুমে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন B5 থাকে।
-
মিষ্টি আলু ও আলু: এগুলোতে উচ্চমাত্রায় এই ভিটামিন বিদ্যমান।
-
বাদাম ও বীজ: বিশেষ করে সূর্যমুখীর বীজ ও চিনা বাদাম।
-
অ্যাভোকাডো ও ব্রকলি: উদ্ভিজ্জ উৎসের মধ্যে এগুলো সেরা।
পরামর্শ: ভিটামিন B5 জলে দ্রবণীয় এবং রান্নার উচ্চ তাপে নষ্ট হতে পারে। তাই সবজি খুব বেশি সময় ধরে সেদ্ধ না করে হালকা ভাপে রান্না করে খাওয়া বেশি উপকারী।
