x
d o c t o r s 2 4
সেলেনিয়াম ঘাটতির ৬০ দিন আগেই শরীর আমাদের যেভাবে সতর্ক করে
23 Feb

সেলেনিয়াম (Selenium) শরীরের জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং খনিজ, যা থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা এবং ডিএনএ সুরক্ষায় অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।

এটি একটি ‘ট্রেস মিনারেল’, যার অর্থ শরীরে খুব সামান্য পরিমাণে এটি প্রয়োজন হলেও এর অভাব হলে পুরো সিস্টেম ভেঙে পড়তে পারে। সেলেনিয়ামের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়ার প্রায় ২ মাস আগে থেকেই শরীর কিছু সতর্কতামূলক সংকেত দিতে শুরু করে।

আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের এক নীরব কারিগর হলো সেলেনিয়াম। মাটির পুষ্টিগুণ কমে যাওয়ায় এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সেলেনিয়াম ঘাটতি এক নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

চিকিৎসকদের মতে, সেলেনিয়ামের অভাব চূড়ান্ত হওয়ার প্রায় ২ মাস আগে থেকেই শরীর ৭টি বিশেষ লক্ষণের মাধ্যমে আমাদের সতর্ক করে। সঠিক সময়ে এগুলো শনাক্ত করতে পারলে হার্টের সমস্যা বা থাইরয়েডের জটিলতা এড়ানো সম্ভব।

সেলেনিয়াম ঘাটতির ২ মাস আগে যে ৭টি লক্ষণ দেখা দেয়:

১. অস্বাভাবিক হারে চুল পড়া (Hair Loss)

সেলেনিয়াম চুল গজানোর প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে এবং চুলের গোড়াকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। ২ মাস আগে থেকেই আপনি লক্ষ্য করতে পারেন যে আপনার চুল গোছা গোছা ঝরে পড়ছে। অন্যান্য ভিটামিনের অভাবে চুল ভঙ্গুর হয়, কিন্তু সেলেনিয়ামের অভাবে সাধারণত চুলের ফলিকল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অসময়ে চুল পাতলা হয়ে যায়।

২. নখের ওপর সাদা দাগ ও দুর্বলতা (Nails Discoloration)

আপনার নখের ওপর কি ছোট ছোট সাদা দাগ দেখা যাচ্ছে? একে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় অনেক সময় লিউকোনিচিয়া (Leukonychia) বলা হয়। সেলেনিয়াম ঘাটতি শুরু হওয়ার ১-২ মাসের মধ্যে নখ তার স্বাভাবিক রং হারিয়ে সাদাটে হয়ে যেতে পারে এবং নখগুলো সহজেই ভেঙে যায়।

৩. পেশির প্রচণ্ড দুর্বলতা ও ব্যথা (Muscle Weakness)

সেলেনিয়াম পেশির কোষগুলোকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। এর ঘাটতি শুরু হলে পেশিতে শক্তি কমে যায় এবং কোনো কারণ ছাড়াই হাত-পায়ে ব্যথা হতে পারে। ২ মাস আগে থেকেই আপনি অনুভব করতে পারেন যে সাধারণ চলাফেরায় পেশিতে টান লাগছে বা ভারী কিছু তুলতে আগের চেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে।

৪. প্রজনন ক্ষমতা কমে যাওয়া (Infertility Issues)

সেলেনিয়াম শুক্রাণুর গতিশীলতা এবং নারীর প্রজননতন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি। ২ মাস আগে থেকেই হরমোনের তারতম্য বা সন্তান ধারণে সমস্যার মতো সূক্ষ্ম লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে পারে। পুরুষের ক্ষেত্রে শুক্রাণুর মান কমে যাওয়া এই খনিজের অভাবের অন্যতম প্রাথমিক সংকেত।

৫. মানসিক কুয়াশা বা ব্রেন ফগ (Brain Fog)

সেলেনিয়াম মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারগুলোকে সক্রিয় রাখে। এর অভাব শুরু হলে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায় এবং কোনো কিছু মনে রাখতে কষ্ট হয়। ৬০ দিন আগে থেকেই আপনি যদি নিজেকে মানসিকভাবে আগের চেয়ে ধীর বা বিভ্রান্ত মনে করেন, তবে এটি সেলেনিয়াম ঘাটতির লক্ষণ হতে পারে।

৬. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া

বারবার সর্দি-কাশি বা ইনফেকশনে আক্রান্ত হওয়া সেলেনিয়াম ঘাটতির একটি বড় চিহ্ন। এটি শরীরের ‘ন্যাচারাল কিলার সেল’ তৈরি করতে সাহায্য করে। ২ মাস আগে থেকেই আপনার সাধারণ ছোটখাটো অসুখ সারতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে।

৭. থাইরয়েড গ্রন্থির অস্বাভাবিকতা

থাইরয়েড হরমোন (T3 ও T4) সক্রিয় করতে সেলেনিয়াম অপরিহার্য। এর অভাব শুরু হলে ঘাড়ের কাছে অস্বস্তি, হুট করে ওজন বেড়ে যাওয়া বা অতিরিক্ত শীত অনুভব করার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। এটি মূলত হাইপোথাইরয়েডিজমের প্রাথমিক ধাপ হতে পারে।

সেলেনিয়াম ও ক্যানসার প্রতিরোধ

সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, সেলেনিয়াম কোষের ডিএনএ মেরামতে সাহায্য করে এবং ক্ষতিকারক ফ্রি-র‍্যাডিক্যালস ধ্বংস করে। যারা পর্যাপ্ত সেলেনিয়াম গ্রহণ করেন না, তাদের ক্ষেত্রে কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ঝুঁকি বা ক্যানসারের প্রবণতা অন্যদের তুলনায় কিছুটা বেশি দেখা দিতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদী ঘাটতি শরীরের জন্য ভয়াবহ হতে পারে।

সেলেনিয়ামের সেরা ৫টি উৎস

সাপ্লিমেন্টের চেয়ে প্রাকৃতিক উৎস থেকে সেলেনিয়াম গ্রহণ করা সবচেয়ে নিরাপদ:

  • ব্রাজিল নাট (Brazil Nuts): এটি সেলেনিয়ামের রাজা। দিনে মাত্র ১-২টি বাদাম খেলেই আপনার দৈনিক চাহিদা ১০০% পূরণ হয়।

  • সামুদ্রিক মাছ: টুনা, সারডিন এবং চিংড়িতে প্রচুর সেলেনিয়াম থাকে।

  • ডিম ও মুরগির মাংস: এগুলো প্রোটিনের পাশাপাশি ভালো পরিমাণে সেলেনিয়াম সরবরাহ করে।

  • বাদামি চাল ও ওটস: শস্য জাতীয় খাবারের মধ্যে এগুলো বেশ সমৃদ্ধ।

  • সূর্যমুখীর বীজ: বিকেলের স্ন্যাকস হিসেবে এটি সেলেনিয়ামের চমৎকার উৎস।

বিশেষ সতর্কবাণী: সেলেনিয়াম যেমন জরুরি, তেমনি এর আধিক্য বা অতিরিক্ত গ্রহণ (Selenosis) বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে। তাই সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

Leave A Comment