ক্রোমিয়াম (Chromium) আমাদের শরীরের জন্য এমন একটি খনিজ যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে পর্দার আড়ালে কাজ করে। আমাদের শরীর খুব সামান্য পরিমাণ ক্রোমিয়াম ব্যবহার করলেও এর অভাব হলে পুরো বিপাকীয় প্রক্রিয়া (Metabolism) ওলটপালট হয়ে যেতে পারে।
সাধারণত ক্রোমিয়াম ঘাটতি ধরা পড়তে সময় লাগে, কিন্তু রক্তে শর্করার ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট হওয়ার অন্তত ৩ মাস আগে থেকেই শরীর কিছু বিশেষ সংকেত দিতে শুরু করে।
ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের কথা উঠলেই আমরা চিনি বা কার্বোহাইড্রেটের কথা ভাবি। কিন্তু অনেকেই জানি না যে, এই শর্করা হজম করার মূল চাবিকাঠি হলো ‘ক্রোমিয়াম’। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, মাটিতে খনিজের অভাব এবং অতিরিক্ত পরিশোধিত খাবার (যেমন সাদা চিনি বা ময়দা) খাওয়ার ফলে শরীরে ক্রোমিয়ামের ভাণ্ডার দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।
এই খনিজের অভাব মারাত্মক হওয়ার প্রায় ৯০ দিন বা ৩ মাস আগে থেকেই শরীর ৪টি সূক্ষ্ম সংকেত পাঠাতে শুরু করে।
ক্রোমিয়াম ঘাটতির ৩ মাস আগে যে ৪টি লক্ষণ দেখা দেয়:
১. মিষ্টি জাতীয় খাবারের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা (Sugar Cravings)
ক্রোমিয়ামের প্রধান কাজ হলো ইনসুলিনকে কোষের দরজায় কড়া নাড়তে সাহায্য করা যাতে কোষ রক্ত থেকে চিনি গ্রহণ করতে পারে। যখন ক্রোমিয়াম কমে যায়, কোষগুলো পর্যাপ্ত শক্তি পায় না। ফলে ৩ মাস আগে থেকেই আপনি লক্ষ্য করবেন যে নোনতা খাবারের চেয়ে মিষ্টি, চকোলেট বা কোল্ড ড্রিঙ্কসের প্রতি আপনার আকাঙ্ক্ষা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এটি শরীরের জ্বালানি সংকটের একটি প্রাথমিক চিৎকার।
২. হুটহাট মেজাজ পরিবর্তন ও দুশ্চিন্তা (Mood Swings and Anxiety)
রক্তে শর্করার মাত্রার ওঠানামা সরাসরি আমাদের মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারকে প্রভাবিত করে। ক্রোমিয়াম কম থাকলে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল থাকে না। এর ফলে ৩ মাস আগে থেকেই রোগী অকারণে অস্থিরতা, হঠাত রাগ বা বিষণ্ণতা অনুভব করতে পারেন। যদি দেখেন আপনার মেজাজ রোলার-কোস্টারের মতো ওঠানামা করছে, তবে সেটি ক্রোমিয়ামের অভাব হতে পারে।
৩. খাওয়ার পরপরই অতিরিক্ত ক্লান্তি বোধ করা (Post-Meal Fatigue)
সাধারণত খাবার খাওয়ার পর আমাদের শক্তি পাওয়ার কথা। কিন্তু ক্রোমিয়াম না থাকলে ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করতে পারে না, ফলে রক্তে চিনি থাকলেও তা কোষে ঢুকতে পারে না। ৩ মাস আগে থেকেই আপনি লক্ষ্য করবেন যে দুপুরের বা রাতের ভারি খাবার খাওয়ার ঠিক পরেই আপনার প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে বা শরীর ভীষণ ছেড়ে দিচ্ছে।
৪. ওজন নিয়ন্ত্রণে বাধা ও পেটে চর্বি জমা
ক্রোমিয়াম ফ্যাট এবং প্রোটিন বিপাকেও সাহায্য করে। এর অভাব শুরু হলে শরীরের চর্বি পোড়ানোর ক্ষমতা কমে যায়। ৩ মাস আগে থেকেই আপনি খেয়াল করতে পারেন যে ডায়েট বা ব্যায়াম করা সত্ত্বেও পেটের চারপাশের মেদ (Visceral Fat) কিছুতেই কমছে না। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের এই প্রাথমিক ধাপটি ক্রোমিয়াম স্বল্পতার একটি বড় লক্ষণ।
ক্রোমিয়াম ও ‘গ্লুকোজ টলারেন্স ফ্যাক্টর’
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ক্রোমিয়াম শরীরে ‘গ্লুকোজ টলারেন্স ফ্যাক্টর’ (GTF) নামক একটি অণু তৈরি করে। এই অণুটি ইনসুলিনের কার্যকারিতা প্রায় ১০০ গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই যারা দীর্ঘ সময় ধরে ক্রোমিয়াম ঘাটতিতে ভোগেন, তাদের ক্ষেত্রে অকাল বার্ধক্য এবং ধমনী শক্ত হয়ে যাওয়ার (Atherosclerosis) ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
ক্রোমিয়ামের প্রাকৃতিক উৎস ও প্রতিকার
সাপ্লিমেন্টের চেয়ে প্রাকৃতিক উৎস থেকে ক্রোমিয়াম গ্রহণ করলে শরীর তা দ্রুত শোষণ করতে পারে:
-
ব্রকলি: এটি ক্রোমিয়ামের শ্রেষ্ঠ উদ্ভিজ্জ উৎস। এক কাপ রান্না করা ব্রকলিতে প্রচুর ক্রোমিয়াম থাকে।
-
আস্ত দানা শস্য: লাল চাল, ওটস এবং হোল হুইট ব্রেড।
-
আপেল ও কলা: ফলের মধ্যে এই দুটি ক্রোমিয়ামের ভালো উৎস।
-
রসুন ও তুলসী: প্রতিদিনের রান্নায় রসুন ব্যবহার করলে ক্রোমিয়ামের শোষণ ক্ষমতা বাড়ে।
-
সামুদ্রিক মাছ: বিশেষ করে টুনা ও শেলফিশ।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: আপনি যদি গর্ভবতী হন বা কিডনি জটিলতায় ভোগেন, তবে ক্রোমিয়াম সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
