থাইরয়েড নোডুল হলো থাইরয়েড গ্রন্থির ভেতরে তৈরি হওয়া এক ধরণের ছোট টিউমার বা পিণ্ড। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই নোডুলগুলো ক্ষতিকারক হয় না, তবে এগুলো হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে এবং বড় হয়ে গেলে শ্বাসনালীতে চাপ সৃষ্টি করে। থাইরয়েড নোডুলটি যখন বাইরে থেকে দৃশ্যমান হয়, তার প্রায় ৬ মাস আগে থেকেই শরীর অত্যন্ত সূক্ষ্ম কিছু সংকেত দিতে শুরু করে।
থাইরয়েড গ্রন্থি আমাদের শরীরের ‘কন্ট্রোল প্যানেল’ হিসেবে পরিচিত। যখনই এই গ্রন্থির কোনো অংশে কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে, তখনই সেখানে নোডুল বা পিণ্ড তৈরি হয়। পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষের জীবনে কোনো না কোনো সময় ছোট থাইরয়েড নোডুল তৈরি হয়, যার বেশিরভাগই ধরা পড়ে না।
চিকিৎসকদের মতে, নোডুলটি স্পষ্ট হওয়ার অন্তত ৬ মাস আগে থেকেই শরীরের বিপাক এবং গলার ভেতরের টিস্যুতে কিছু পরিবর্তন আসতে শুরু করে। এই প্রাথমিক লক্ষণগুলো চিনতে পারলে জটিল অস্ত্রোপচার বা বায়োপসি এড়ানো সম্ভব।
থাইরয়েড নোডুলের ৬ মাস আগে যে ৭টি লক্ষণ দেখা দেয়:
১. গলায় কিছু আটকে থাকার অবাস্তব অনুভূতি (Globus Sensation)
নোডুলটি যখন খুব ছোট থাকে, তখন এটি বাইরে থেকে দেখা যায় না। তবে ৬ মাস আগে থেকেই রোগী অনুভব করতে পারেন যে তার গলার ভেতরে কিছু একটা আটকে আছে। ঢোক গিলার সময় বা কথা বলার সময় মনে হতে পারে গলার কাছে কিছু একটা দলা পাকিয়ে আছে, যদিও আয়নায় কিছু দেখা যায় না।
২. অকারণে বারবার গলা পরিষ্কার করার প্রবণতা
নোডুল বড় হতে শুরু করলে তা কণ্ঠনালী বা ল্যারিক্সের ওপর মৃদু চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে গলার ভেতরে এক ধরণের সুরসুরি বা অস্বস্তি হয়। ৬ মাস আগে থেকেই আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো কারণ ছাড়াই বারবার গলা খাঁকারি দিয়ে পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন (Frequent Throat Clearing)।
৩. কণ্ঠস্বরে সূক্ষ্ম পরিবর্তন (Hoarseness)
থাইরয়েড গ্রন্থির পাশ দিয়েই চলে গেছে ভোকাল কর্ডের স্নায়ু। নোডুলটি যদি সেই স্নায়ুর দিকে বাড়তে থাকে, তবে কণ্ঠস্বরে পরিবর্তন আসে। ৬ মাস আগে থেকেই আপনি লক্ষ্য করতে পারেন যে আপনার গলার স্বর আগের চেয়ে কিছুটা মোটা বা খসখসে হয়ে যাচ্ছে, যা সাধারণ সর্দি-কাশির সাথে সম্পর্কিত নয়।
৪. ঘাড়ের পেছনে বা চোয়ালে রহস্যময় ব্যথা
অনেক সময় থাইরয়েড নোডুলের ব্যথা সরাসরি গলায় না হয়ে কানে, চোয়ালে বা ঘাড়ের পেছনের দিকে ছড়িয়ে পড়ে (Referred Pain)। ৬ মাস আগে থেকেই আপনি যদি অনুভব করেন যে আপনার ঘাড়ের একপাশে একটানা ব্যথা বা অস্বস্তি হচ্ছে এবং ব্যথানাশক ওষুধেও তা কমছে না, তবে এটি থাইরয়েডের সংকেত হতে পারে।
৫. ঘুমানোর সময় শ্বাস-প্রশ্বাসে সামান্য অস্বস্তি
যখন আপনি চিৎ হয়ে শুয়ে থাকেন, তখন মাধ্যাকর্ষণের কারণে ছোট নোডুলটিও শ্বাসনালীর ওপর চাপ দিতে পারে। ৬ মাস আগে থেকেই রাতে ঘুমানোর সময় হঠাত করে দম বন্ধ হয়ে আসা বা ঘুমের মধ্যে অস্বাভাবিক নাক ডাকার প্রবণতা শুরু হতে পারে।
৬. হঠাত হঠাত বুক ধড়ফড় করা (Palpitations)
কিছু নোডুল ‘টক্সিক’ বা বিষাক্ত হয়, যা অতিরিক্ত থাইরয়েড হরমোন নিঃসরণ করে। এর ফলে কোনো পরিশ্রম ছাড়াই বুক ধড়ফড় করা, হাত কাঁপা বা অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। ৬ মাস আগে থেকেই এই মেটাবলিক পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করা যায়।
৭. কলার বা টাই পরলে অস্বস্তি বোধ করা
এটি থাইরয়েড নোডুলের অন্যতম সূক্ষ্ম লক্ষণ। ৬ মাস আগে থেকেই আপনি খেয়াল করতে পারেন যে শার্টের বোতাম আটকালে বা গলার খুব কাছে কোনো পোশাক থাকলে আপনার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে বা দমবন্ধ ভাব লাগছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে থাইরয়েড গ্রন্থির আয়তন বাড়তে শুরু করেছে।
জেনেটিক্স ও আয়োডিনের ভূমিকা
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, থাইরয়েড নোডুল হওয়ার পেছনে শুধু আয়োডিনের অভাব নয়, বরং অতিরিক্ত আয়োডিন গ্রহণও দায়ী হতে পারে। এছাড়া জিনগত কারণ এবং পরিবেশ দূষণ (বিশেষ করে প্লাস্টিকের রাসায়নিক) এই নোডুল তৈরির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। তাই লক্ষণগুলো দেখা দিলে শুধু রক্ত পরীক্ষা নয়, একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম (USG of Thyroid) করা জরুরি।
প্রতিরোধে করণীয়
-
সুষম খাদ্য: অতিরিক্ত লবণ বা আয়োডিন এড়িয়ে পরিমাণমতো সামুদ্রিক মাছ ও সবজি খান।
-
সেসেলেনিয়াম: প্রতিদিন ২-৩টি কাঠবাদাম বা ব্রাজিল নাট খেলে থাইরয়েডের প্রদাহ কমে।
-
সেল্ফ-চেক: আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জল খাওয়ার সময় লক্ষ্য করুন গলার মাঝখানে কোনো ফোলা অংশ ওঠানামা করছে কি না।
বিশেষ পরামর্শ: থাইরয়েড নোডুলের ৯৫ শতাংশই ক্যানসার নয়। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সময়মতো এন্ডোক্রাইনোলজিস্টের পরামর্শ নিন।
