x
d o c t o r s 2 4
গ্যাংগ্রিন কেন একটি 'মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি'?
28 Feb

গ্যাংগ্রিন কোনো সাধারণ ক্ষত নয়; এটি শরীরের একটি নির্দিষ্ট অংশের কোষ বা টিস্যুর ‘মৃত্যু’। যখন শরীরের কোনো অংশে রক্ত চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় বা গুরুতর সংক্রমণ ঘটে, তখন সেখানে অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না এবং টিস্যুগুলো পচতে শুরু করে। সময়মতো চিকিৎসা না করলে এটি পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।

আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রতিটি কোষে অক্সিজেনের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ প্রয়োজন। যখন কোনো কারণে রক্তনালী বাধাগ্রস্ত হয় বা ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া টিস্যুকে আক্রমণ করে, তখন সেই অংশটি প্রাণহীন বা কালো হয়ে যায়—চিকিৎসা বিজ্ঞানে একেই বলা হয় গ্যাংগ্রিন (Gangrene)। এটি সাধারণত হাত বা পায়ের আঙুলে বেশি দেখা দিলেও শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গেও (যেমন অন্ত্র বা পিত্তথলি) হতে পারে।

গ্যাংগ্রিনের ধরণ ও লক্ষণ

গ্যাংগ্রিন মূলত দুই ধরণের হয়, যার লক্ষণগুলো ভিন্ন:

  • শুষ্ক গ্যাংগ্রিন (Dry Gangrene): এটি রক্ত সঞ্চালন কমে যাওয়ার ফলে ঘটে। সাধারণত ডায়াবেটিস বা ধমনীর রোগে এটি বেশি হয়।

    • আক্রান্ত স্থানটি শুকনো এবং কুঁচকানো দেখায়।

    • চামড়ার রং নীল বা কালো হয়ে যায়।

    • আক্রান্ত অংশটি ঠান্ডা এবং অসাড় মনে হয়।

  • ভেজা গ্যাংগ্রিন (Wet Gangrene): এটি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ফলে ঘটে। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক কারণ এটি দ্রুত ছড়ায়।

    • আক্রান্ত স্থানে প্রচণ্ড ফোলা এবং পুঁজ দেখা দেয়।

    • অসহ্য দুর্গন্ধ বের হয়।

    • জ্বর এবং শরীর কাঁপানো থাকে।

গ্যাংগ্রিন কেন হয়? (প্রধান কারণসমূহ)

১. ডায়াবেটিস: রক্তে অতিরিক্ত শর্করার কারণে রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে পায়ে রক্ত চলাচল কমে যায় এবং ছোট ক্ষত থেকেও গ্যাংগ্রিন হতে পারে।

২. রক্তনালীর রোগ: এথেরোস্ক্লেরোসিস বা ধমনীতে চর্বি জমার কারণে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া।

৩. গুরুতর আঘাত: দুর্ঘটনা বা আগুনে পোড়ার ফলে টিস্যু সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হলে।

৪. ধূমপান: তামাক রক্তনালীকে সংকুচিত করে দেয়, যা গ্যাংগ্রিনের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

নতুন তথ্য: ‘গ্যাস গ্যাংগ্রিন’ ও আধুনিক ঝুঁকি

বর্তমানে ক্লোস্ট্রিডিয়াম (Clostridium) নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে হওয়া গ্যাস গ্যাংগ্রিন নিয়ে চিকিৎসকরা বেশি উদ্বিগ্ন। এই ব্যাকটেরিয়া টিস্যুর ভেতরে গ্যাস তৈরি করে, যা কোষগুলোকে দ্রুত মেরে ফেলে। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, যারা অতিরিক্ত স্টেরয়েড গ্রহণ করেন বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে সামান্য নখের কোণ কাটা থেকেও এই ঘাতক সংক্রমণ শুরু হতে পারে।

জরুরি চিকিৎসা ও জীবনরক্ষা

গ্যাংগ্রিন শনাক্ত হওয়া মাত্র রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা বাধ্যতামূলক। চিকিৎসার প্রধান ধাপগুলো হলো:

  • ডিব্রাইডমেন্ট (Debridement): অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মৃত টিস্যুগুলো কেটে ফেলে দেওয়া যাতে সংক্রমণ সুস্থ অংশে না ছড়ায়।

  • অ্যান্টিবায়োটিক: সংক্রমণ রুখতে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক শিরায় প্রয়োগ করা হয়।

  • হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি: রোগীকে একটি বিশেষ চেম্বারে রেখে উচ্চ চাপে অক্সিজেন দেওয়া হয়, যা ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে এবং টিস্যু সুস্থ করতে সাহায্য করে।

  • অ্যাম্পুটেশন (Amputation): যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে জীবন বাঁচাতে আক্রান্ত অঙ্গটি কেটে বাদ দিতে হতে পারে।

প্রতিরোধে করণীয়

গ্যাংগ্রিন প্রতিরোধের সেরা উপায় হলো পায়ের সঠিক যত্ন নেওয়া। বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীরা প্রতিদিন আয়নার সাহায্যে পায়ের তলা পরীক্ষা করুন। কোনো ছোট লালচে দাগ, ফোস্কা বা কাটা দেখা দিলে তা অবহেলা করবেন না। খালি পায়ে হাঁটা বন্ধ করুন এবং আরামদায়ক জুতো পরুন।

বিশেষ সতর্কবার্তা: যদি শরীরের কোনো অংশ হঠাত ফ্যাকাশে বা কালো হয়ে যায় এবং সেখানে তীব্র ব্যথার পর কোনো অনুভূতি না থাকে, তবে এক মুহূর্ত দেরি না করে জরুরি বিভাগে যোগাযোগ করুন।

Leave A Comment