x
d o c t o r s 2 4
01 Feb

অ্যাড্রেনো লিউকোডিস্ট্রফি (Adrenoleukodystrophy—ALD) একটি বিরল ও বংশগত (X-linked) রোগ, যেখানে শরীরে ভেরি লং চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড (VLCFA) ভাঙার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে এই চর্বিজাত উপাদান মস্তিষ্কের সাদা পদার্থ (white matter), স্নায়ু ও অ্যাড্রিনাল গ্রন্থিতে জমে মারাত্মক ক্ষতি করে। রোগটি শিশুদের মধ্যে বেশি পরিচিত হলেও কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও দেখা যায়। ভয়ংকর দিক হলো—রোগটি পুরোপুরি প্রকাশ পাওয়ার প্রায় ৩ মাস আগেই শরীর কিছু সতর্ক সংকেত দেয়, যা দ্রুত শনাক্ত করা গেলে বড় ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।

অ্যাড্রেনো লিউকোডিস্ট্রফি কেন এত বিপজ্জনক?

ALD ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের মাইলিন নষ্ট করে, ফলে আচরণ, স্মৃতি, দৃষ্টি ও চলাফেরার ক্ষমতা দ্রুত অবনতি ঘটে। পাশাপাশি অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অ্যাডিসন ডিজিজ-এর মতো হরমোনজনিত জটিলতা দেখা দিতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, লক্ষণ শুরুর একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করলে রোগের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর করা যায়।

৩ মাস আগে শরীরে দেখা দেয় যে ৭টি লক্ষণ

নিচে অ্যাড্রেনোলিউকোডিস্ট্রফির সম্ভাব্য প্রাথমিক লক্ষণগুলো তুলে ধরা হলো—

১. আচরণ ও ব্যক্তিত্বে হঠাৎ পরিবর্তন
শিশু বা কিশোর হঠাৎ মনোযোগ হারানো, পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাওয়া, অতিরিক্ত রাগ বা চুপচাপ হয়ে যাওয়া—এগুলো অনেক সময় মানসিক সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাওয়া হয়।

২. স্মৃতিশক্তি ও শেখার ক্ষমতা কমে যাওয়া
সাম্প্রতিক বিষয় মনে রাখতে সমস্যা, সহজ নির্দেশনা বুঝতে দেরি হওয়া—এটি মস্তিষ্কের সাদা পদার্থ ক্ষতির প্রাথমিক ইঙ্গিত।

৩. দৃষ্টিশক্তির সমস্যা
ঝাপসা দেখা, পড়ার সময় চোখে চাপ লাগা বা দৃষ্টিক্ষেত্র সংকুচিত হওয়া—এসব লক্ষণ অনেক সময় চোখের সাধারণ সমস্যা মনে হলেও আসলে স্নায়বিক।

৪. হাঁটাচলায় অস্বস্তি ও ভারসাম্যহীনতা
হোঁচট খাওয়া, সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট বা আগের মতো দৌড়াতে না পারা—এসব মাইলিন ক্ষয়ের আগাম সংকেত।

৫. অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা
পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরও সারাদিন ক্লান্ত লাগা ALD-এর সঙ্গে যুক্ত অ্যাড্রিনাল অকার্যকারিতার লক্ষণ হতে পারে।

৬. ত্বক গাঢ় হয়ে যাওয়া ও লবণজাত খাবারের প্রতি আকর্ষণ
অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ত্বকের রঙ ধীরে ধীরে গাঢ় হয় এবং শরীরে সোডিয়াম ঘাটতির কারণে লবণ খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোনজনিত ইঙ্গিত।

৭. বমিভাব বা রক্তচাপ কমে যাওয়া
হালকা বমি, মাথা ঘোরা বা হঠাৎ দাঁড়ালে চোখ অন্ধকার হয়ে আসা—এসব অ্যাড্রিনাল সংকটের আগাম লক্ষণ হতে পারে।

নতুন তথ্য যা জানা জরুরি

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিউবর্ন স্ক্রিনিং-এ ALD অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় অনেক দেশে রোগটি লক্ষণ শুরুর আগেই ধরা পড়ছে। এছাড়া স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্ট ও জিন থেরাপি প্রাথমিক পর্যায়ে শুরু করলে শিশুদের মস্তিষ্কের ক্ষতি অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব—এমন আশাব্যঞ্জক তথ্য সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে।

কখন পরীক্ষা করানো জরুরি?

যদি উপরোক্ত একাধিক লক্ষণ একসঙ্গে দেখা যায়, বিশেষ করে পরিবারের কারও ALD বা অজানা স্নায়ুরোগের ইতিহাস থাকলে, দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। VLCFA রক্ত পরীক্ষা, মস্তিষ্কের MRI ও জেনেটিক টেস্ট রোগ নির্ণয়ে সহায়ক।

অ্যাড্রেনো লিউকোডিস্ট্রফি নীরবে কিন্তু দ্রুত শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত করে। তবে শরীরের আগাম সংকেতগুলো চিনে ফেলতে পারলে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব। আচরণগত পরিবর্তন, দৃষ্টি বা হাঁটার সমস্যাকে হালকাভাবে না নিয়ে সচেতন হওয়াই এই মারাত্মক রোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

Leave A Comment