x
d o c t o r s 2 4
03 Feb

উইলসন ডিজিজ (Wilson Disease) একটি বিরল কিন্তু অত্যন্ত জটিল জেনেটিক রোগ। এটি মূলত শরীরে কপার বা তামা বিপাক প্রক্রিয়ার একটি ত্রুটি। সাধারণত আমাদের শরীর প্রয়োজনের অতিরিক্ত তামা যকৃতের মাধ্যমে বের করে দেয়, কিন্তু এই রোগে আক্রান্তদের শরীরে তামা জমতে শুরু করে। ২০২৬ সালের আধুনিক চিকিৎসা গবেষণা বলছে, লিভার বা মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার অন্তত ৪ থেকে ৫ মাস আগে শরীর কিছু সূক্ষ্ম সংকেত দিতে শুরু করে।

প্রাথমিক পর্যায়ে এই লক্ষণগুলো শনাক্ত করতে পারলে প্রাণঘাতী ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। উইলসন ডিজিজের সেই আগাম সতর্কবার্তা নিয়ে আজকের বিশেষ প্রতিবেদন।

উইলসন ডিজিজ মূলত একটি বংশগত রোগ। যদি সময়মতো চিকিৎসা না করা হয়, তবে শরীরে জমে থাকা তামা লিভার ফেইলিওর বা স্নায়বিক বৈকল্য ঘটাতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, পূর্ণমাত্রায় রোগটি প্রকাশ পাওয়ার কয়েক মাস আগেই শরীরের ৫টি জায়গায় পরিবর্তন দেখা দেয়।

১. কায়সার-ফ্লেশার রিং (চোখের মণির চারপাশে বাদামী বলয়)

এটি উইলসন ডিজিজের সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। চোখের মণির চারপাশের কর্নিয়াতে তামা জমার কারণে একটি সোনালী-বাদামী বা তামাটে রঙের বলয় তৈরি হয়। এটি খালি চোখে ধরা না পড়লেও একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ ‘স্লিট-ল্যাম্প’ পরীক্ষার মাধ্যমে রোগের চূড়ান্ত পর্যায়ের অন্তত ৪ মাস আগেই এটি শনাক্ত করতে পারেন।

২. অকারণ ক্লান্তি এবং পেটে অস্বস্তি (Early Liver Signs)

রোগটি যখন প্রাথমিক স্তরে থাকে, তখন লিভার তামা সরাতে হিমশিম খায়। ফলে রোগী অকারণে ক্লান্তি অনুভব করেন। পেটের ডানদিকের ওপরের অংশে হালকা ব্যথা বা অস্বস্তি হতে পারে। অনেক সময় একে সাধারণ গ্যাস বা হজমের সমস্যা বলে ভুল করা হয়, যা রোগ নির্ণয়ে দেরি করিয়ে দেয়।

৩. হাত-পায়ে সূক্ষ্ম কাঁপুনি এবং পেশির জড়তা

তামা যখন লিভার ছাড়িয়ে মস্তিষ্কের ‘ব্যাসাল গ্যাংলিয়া’ অংশে জমতে শুরু করে, তখন শরীরে মৃদু কাঁপুনি (Tremor) দেখা দেয়। লিখতে গেলে হাত কাঁপা বা হাঁটতে গেলে ভারসাম্যহীনতা বোধ করা এর প্রাথমিক লক্ষণ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ব্যক্তি নিজের অজান্তেই পেশিতে টান অনুভব করছেন বা কথা বলার গতি কিছুটা ধীর হয়ে আসছে।

৪. মেজাজের আকস্মিক পরিবর্তন ও উদ্বেগ

উইলসন ডিজিজের একটি কম আলোচিত দিক হলো এর মানসিক প্রভাব। রোগের জটিলতা বাড়ার কয়েক মাস আগে থেকেই রোগীর আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেয়। হঠাত খুব বেশি রেগে যাওয়া, বিষণ্ণতা (Depression) বা তীব্র উদ্বেগ দেখা দিতে পারে। অনেক সময় একে মানসিক সমস্যা মনে করা হলেও আসলে এটি মস্তিষ্কে তামা জমার কুফল।

৫. নখের নিচে নীলচে ভাব (Azure Lunula)

২০২৬ সালের নতুন ক্লিনিকাল পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, উইলসনস ডিজিজে আক্রান্ত কিছু রোগীর নখের গোড়ায় থাকা অর্ধচন্দ্রাকৃতি অংশে (Lunula) নীলচে আভা দেখা যায়। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘অ্যাজুর লুনুলা’ বলা হয়। এটি শরীরে অতিরিক্ত তামার উপস্থিতির একটি বিরল কিন্তু শক্তিশালী সংকেত।

শণাক্তকরণের আধুনিক উপায় ও করণীয়

যদি আপনার বা আপনার পরিচিত কারও মধ্যে এই লক্ষণগুলো দেখা দেয়, তবে দ্রুত নিচের পরীক্ষাগুলো করা জরুরি:

  • সেরুলোপ্লাজমিন টেস্ট: রক্তে এই প্রোটিনের মাত্রা কম থাকা উইলসনস ডিজিজের লক্ষণ।

  • ২৪ ঘণ্টার ইউরিন কপার টেস্ট: প্রস্রাবের মাধ্যমে কতটা তামা বের হচ্ছে তা পরীক্ষা করা।

  • লিভার বায়োপসি: এটি নিশ্চিতভাবে রোগ নির্ণয়ের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।

নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি

বর্তমানে জিন থেরাপি এবং নতুন ধরনের ‘চিলেটিং এজেন্ট’ (Chelating agents) নিয়ে কাজ চলছে, যা শরীর থেকে তামা অপসারণে আগের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও কম। প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে কেবল নির্দিষ্ট খাদ্যাভ্যাস (তামা সমৃদ্ধ খাবার যেমন- মাশরুম, চকোলেট বা লিভার এড়িয়ে চলা) এবং ওষুধের মাধ্যমে রোগী সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন।

Leave A Comment