এডওয়ার্ডস সিন্ড্রোম একটি বিরল কিন্তু অত্যন্ত গুরুতর জেনেটিক অবস্থা, যা মূলত ক্রোমোজোমের ত্রুটির কারণে ঘটে। গর্ভাবস্থায় বা জন্মের অব্যবহিত পরেই এই রোগের লক্ষণগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে জন্মের ছয় মাস আগেই অর্থাৎ গর্ভাবস্থায় আল্ট্রাসাউন্ড এবং বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে এর সংকেত পাওয়া সম্ভব। নিচে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
এডওয়ার্ডস সিন্ড্রোম কী?
সাধারণত মানুষের শরীরে ৪৬টি ক্রোমোজোম থাকে। কিন্তু কোনো শিশুর কোষে ১৮ নম্বর ক্রোমোজোমটি দুইটির বদলে তিনটি থাকলে তাকে এডওয়ার্ডস সিন্ড্রোম বা ট্রাইসোমি ১৮ বলা হয়। এটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করে।
গর্ভাবস্থায় বা জন্মের আগে শনাক্তযোগ্য ৭টি লক্ষণ
গর্ভাবস্থার ১২ থেকে ২০ সপ্তাহের মধ্যে বিভিন্ন স্ক্রিনিং টেস্ট এবং আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে চিকিৎসকরা কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করেন যা এডওয়ার্ডস সিন্ড্রোমের ইঙ্গিত দেয়:
১. ভ্রূণের ধীর বৃদ্ধি (IUGR): গর্ভাবস্থায় ভ্রূণটি প্রত্যাশিত গতিতে বড় হয় না। একে ‘ইন্ট্রাউটেরিন গ্রোথ রেস্ট্রিকশন’ বলা হয়। এটি এই সিন্ড্রোমের অন্যতম প্রধান প্রাথমিক লক্ষণ।
২. অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের আধিক্য: গর্ভবতী মায়ের জরায়ুতে ভ্রূণের চারপাশে যদি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তরল (Polyhydramnios) জমা হয়, তবে তা এডওয়ার্ডস সিন্ড্রোমের ঝুঁকি নির্দেশ করে।
৩. হৃদপিণ্ডের ত্রুটি: প্রায় ৯০% ক্ষেত্রে এই আক্রান্ত শিশুদের হৃদপিণ্ডে ছিদ্র বা গঠনগত সমস্যা থাকে, যা গর্ভাবস্থায় উন্নত আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে শনাক্ত করা যেতে পারে।
৪. মুষ্টিবদ্ধ হাত ও আঙুলের গঠন: এডওয়ার্ডস সিন্ড্রোমে আক্রান্ত ভ্রূণের হাত সাধারণত মুষ্টিবদ্ধ থাকে এবং তর্জনী আঙুলটি মধ্যমা আঙুলের ওপর চড়ে থাকে। এটি একটি অত্যন্ত স্বতন্ত্র শারীরিক বৈশিষ্ট্য।
৫. মাথার অস্বাভাবিক আকৃতি: শিশুর মাথার পেছনের অংশ অস্বাভাবিকভাবে বাইরের দিকে বেরিয়ে থাকে (Prominent Occiput) এবং চোয়াল বা মুখ ছোট হতে পারে।
৬. পায়ের গঠন (Rocker-bottom feet): অনেক সময় শিশুর পায়ের তলা সমতল না হয়ে অনেকটা দোলনা বা নৌকার মতো বাঁকানো থাকে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘রকার-বটম ফিট’ বলা হয়।
৭. নাভির ধমনীর সমস্যা: সাধারণত নাড়িতে (Umbilical Cord) দুটি ধমনী থাকে, কিন্তু এই সিন্ড্রোমে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে অনেক সময় একটি মাত্র ধমনী দেখা যায়।
বর্তমানে এডওয়ার্ডস সিন্ড্রোম শনাক্ত করার জন্য NIPT (Non-Invasive Prenatal Testing) নামক উন্নত রক্ত পরীক্ষা চালু হয়েছে। এটি গর্ভাবস্থার মাত্র ১০ সপ্তাহ থেকেই করা যায় এবং এর নির্ভুলতা অনেক বেশি। এছাড়া মায়েদের বয়স ৩৫ বছরের বেশি হলে এই সিন্ড্রোমে আক্রান্ত শিশু জন্মানোর ঝুঁকি কিছুটা বেড়ে যায়।
প্রতিকার ও সচেতনতা
দুর্ভাগ্যবশত, এডওয়ার্ডস সিন্ড্রোমের কোনো স্থায়ী নিরাময় বা চিকিৎসা নেই। আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশ জন্মের আগেই বা জন্মের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মারা যায়। তবে মোজাইক বা পার্শিয়াল ট্রাইসোমি ১৮-এর ক্ষেত্রে শিশুরা দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতে পারে। নিয়মিত প্রসবপূর্ব চেকআপ এবং স্ক্রিনিং টেস্টের মাধ্যমে আগে থেকে এই অবস্থা সম্পর্কে জেনে রাখা বাবা-মায়ের মানসিক প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত জরুরি।
