নারীর দেহে সবচেয়ে নীরব অথচ মারাত্মক ক্যান্সারগুলোর একটি হলো ওভারিয়ান ক্যান্সার বা ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার। বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর লক্ষাধিক নারী এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, এবং এর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—প্রথম দিকে এর লক্ষণগুলো এতটাই অস্পষ্ট যে তা সহজেই অবহেলিত থেকে যায়। চিকিৎসকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা বুঝতেই পারেন না যে তাদের শরীর অন্তত ৬ মাস আগেই সতর্ক সংকেত পাঠাচ্ছিল।
চলুন জেনে নেওয়া যাক ওভারিয়ান ক্যান্সারের ৬ মাস আগে শরীরে দেখা দিতে পারে এমন ৪টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ, যা কখনওই উপেক্ষা করা উচিত নয়—
১. পেট ফেঁপে যাওয়া ও স্থায়ী ফুলাভাব
ওভারিয়ান ক্যান্সারের সবচেয়ে সাধারণ ও প্রথম দিকের লক্ষণ হলো পেট ফেঁপে থাকা বা স্থায়ী ফুলাভাব।
অনেক নারী এটিকে সাধারণ গ্যাস, বদহজম বা মাসিকের পূর্ববর্তী অস্বস্তি ভেবে অবহেলা করেন।
তবে যদি এই ফুলাভাব প্রতিদিন বা প্রায়ই দেখা দেয়, এবং কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ওভারিয়ান ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ে পেটের ভেতরে টিউমার বা তরল জমে যাওয়ার কারণে এই ফুলাভাব দেখা দেয়।
২. ক্ষুধামান্দ্য ও দ্রুত পেট ভরে যাওয়া
এই ক্যান্সার শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে।
ফলে সামান্য খাবার খেলেই পেট ভরে যায় বা খাবারে আগ্রহ কমে যায়।
যদি এই অবস্থা সপ্তাহের পর সপ্তাহ থাকে, এবং ওজন অকারণে কমতে শুরু করে, তবে এটি ওভারিয়ান ক্যান্সারের প্রাথমিক ইঙ্গিত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ডিম্বাশয়ে তৈরি টিউমার আশপাশের অঙ্গগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে পাকস্থলীতে অস্বস্তি ও হজমে সমস্যা দেখা দেয়।
৩. ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ বা প্রস্রাবে অস্বস্তি
ওভারিয়ান ক্যান্সারের কারণে টিউমার বড় হলে তা মূত্রথলি বা ব্লাডারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
ফলে ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ, প্রস্রাবের সময় জ্বালা, কিংবা প্রস্রাব সম্পূর্ণ না হওয়ার অনুভূতি দেখা যায়।
অনেকে এই লক্ষণকে ইউরিনারি ইনফেকশন বা বয়সজনিত সমস্যা মনে করে এড়িয়ে যান।
কিন্তু যদি সংক্রমণের কোনো প্রমাণ না থাকলেও এই সমস্যা স্থায়ী হয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৪. নিচের পেট বা কোমরে স্থায়ী ব্যথা
ওভারিয়ান ক্যান্সারের আরেকটি প্রাথমিক ও উপেক্ষিত লক্ষণ হলো নিচের পেটে বা কোমরে চাপ বা টান ধরা ধরনের ব্যথা।
এই ব্যথা মাসিকের মতো অনুভূত হলেও, পার্থক্য হলো—এটি আসে ও যায় না, বরং ক্রমাগত থাকে।
কখনও কখনও এই ব্যথা পিঠে বা উরু পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে।
চিকিৎসকরা বলেন, এই ব্যথা তখনই বিপজ্জনক ইঙ্গিত দেয়, যখন এটি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং অন্য কোনো কারণ (যেমন: পিরিয়ড বা ইনফেকশন) দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
চিকিৎসকদের পরামর্শ
- অনেক নারী মনে করেন, ওভারিয়ান ক্যান্সার কেবল বংশগত কারণেই হয়, কিন্তু বাস্তবে জীবনধারা, হরমোনের ভারসাম্য, এবং দীর্ঘমেয়াদি ওভুলেশন সমস্যাও বড় ভূমিকা রাখে।
- যারা ৪০ বছরের বেশি বয়সী, অথবা পরিবারের কারও ব্রেস্ট বা ওভারিয়ান ক্যান্সারের ইতিহাস আছে, তাদের প্রতি বছর একবার পেলভিক আলট্রাসনোগ্রাম ও CA-125 রক্ত পরীক্ষা করানো উচিত।
- দ্রুত শনাক্ত হলে ওভারিয়ান ক্যান্সার ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে সফলভাবে নিরাময়যোগ্য — কিন্তু দেরি হলে চিকিৎসা জটিল হয়ে যায়।
ওভারিয়ান ক্যান্সারকে বলা হয় “Silent Killer” — কারণ এটি ধীরে ধীরে, প্রায় নিঃশব্দে শরীরকে আক্রমণ করে। কিন্তু শরীর নীরব নয়, সে আগেই বার্তা পাঠায়। তাই ফুলাভাব, ক্ষুধামান্দ্য, প্রস্রাবের সমস্যা বা নিচের পেটে স্থায়ী ব্যথাকে অবহেলা না করে সঠিক সময়ে পরীক্ষা করান।
