জন্মগত জেনেটিক রোগগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও অত্যন্ত জটিল একটি অবস্থা হলো ওল্ফ-হিরশহর্ন সিন্ড্রোম (Wolf–Hirschhorn Syndrome বা WHS)। এটি মূলত ৪ নম্বর ক্রোমোজোমের একটি অংশ (4p deletion) হারিয়ে যাওয়ার কারণে ঘটে। এর ফলে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং স্নায়ুতন্ত্র মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই রোগ কেবল জন্মের পর বোঝা যায় না—বরং গর্ভাবস্থার প্রথম ও মধ্য পর্যায়েই (প্রসবের প্রায় এক বছর আগে) কিছু স্পষ্ট লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। এসব সংকেত আগে থেকে শনাক্ত করা গেলে পরিবার ও চিকিৎসকেরা যথাযথ প্রস্তুতি নিতে পারেন।
নিচে তুলে ধরা হলো ওল্ফ-হিরশহর্ন সিন্ড্রোমের ৪টি গুরুত্বপূর্ণ আগাম লক্ষণ—
১. ভ্রূণের বৃদ্ধি অস্বাভাবিকভাবে ধীর হওয়া
গর্ভের শিশুর ওজন ও দৈর্ঘ্য নির্দিষ্ট সময়ে বাড়ার কথা থাকলেও WHS আক্রান্ত ভ্রূণ সাধারণত ছোট থাকে। আল্ট্রাসাউন্ডে দেখা যায় শিশুর বৃদ্ধি বয়সের তুলনায় পিছিয়ে আছে। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানে Intrauterine Growth Restriction (IUGR) বলা হয়। এটি সবচেয়ে সাধারণ ও প্রাথমিক সতর্কবার্তা।
২. মুখমণ্ডল ও মাথার গঠনগত ত্রুটি
বিশেষজ্ঞরা জানান, WHS আক্রান্ত শিশুর মুখের গঠন ভিন্ন ধরনের হতে পারে। আল্ট্রাসাউন্ডে ছোট মাথা (মাইক্রোসেফালি), চওড়া নাকের ব্রিজ, চোখের দূরত্ব বেশি বা ঠোঁট-তালু ফাটা দেখা যেতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যগুলোকে অনেক সময় “Greek warrior helmet appearance” বলা হয়, যা রোগটির পরিচিত চিহ্ন।
৩. হৃদযন্ত্র বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ত্রুটি
গর্ভকালীন ইকোকার্ডিওগ্রাম বা বিস্তারিত স্ক্যানে শিশুর হার্ট, কিডনি বা অন্যান্য অঙ্গে গঠনগত সমস্যা ধরা পড়তে পারে। জন্মগত হৃদরোগ WHS আক্রান্ত অনেক শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যায়। তাই আল্ট্রাসাউন্ডে এমন অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লে জেনেটিক পরীক্ষা জরুরি।
৪. মায়ের রক্ত পরীক্ষায় ক্রোমোজোমের অস্বাভাবিকতা
NIPT, অ্যামনিওসেন্টেসিস বা কোরিওনিক ভিলাস স্যাম্পলিং (CVS) পরীক্ষায় ৪ নম্বর ক্রোমোজোমের ডিলিশন শনাক্ত করা সম্ভব। এসব পরীক্ষায় ঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া গেলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হয়।
কেন আগাম শনাক্তকরণ গুরুত্বপূর্ণ?
গাইনোকোলজিস্ট ও জেনেটিক কাউন্সেলরদের মতে—
- পরিবার মানসিক ও চিকিৎসাগত প্রস্তুতি নিতে পারে
- জন্মের পর বিশেষায়িত চিকিৎসা ও আইসিইউ সুবিধা নিশ্চিত করা যায়
- ভবিষ্যৎ গর্ভধারণে জেনেটিক ঝুঁকি মূল্যায়ন করা সহজ হয়
জন্মের পর কী সমস্যা দেখা দিতে পারে?
WHS আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে খিঁচুনি, খাওয়ার সমস্যা, বুদ্ধিবিকাশে বিলম্ব, কম ওজন এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। তাই জন্মের পর দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও থেরাপি প্রয়োজন হয়।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
- পরিবারে জেনেটিক রোগের ইতিহাস থাকলে
- মায়ের বয়স বেশি হলে
- পূর্বে অস্বাভাবিক শিশুর জন্ম বা গর্ভপাতের ইতিহাস থাকলে
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
চিকিৎসকেরা বলছেন, “গর্ভাবস্থায় নিয়মিত স্ক্রিনিং ও আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষাকে অবহেলা করলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংকেত মিস হয়ে যায়।” তাই সামান্য অস্বাভাবিকতা দেখলেই দেরি না করে জেনেটিক বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
ওল্ফ-হিরশহর্ন সিন্ড্রোম বিরল হলেও সচেতনতা ও আগাম পরীক্ষাই পারে ঝুঁকি কমাতে। মা ও শিশুর সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য গর্ভকালীন যত্নে সতর্কতাই হতে পারে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
