x
d o c t o r s 2 4
27 Jan

মদ্যপান না করেও লিভার বা যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি জমে যাওয়ার এক নীরব ব্যাধি ‘নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ’ (NAFLD)। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন যে, এই চর্বি যখন যকৃতের প্রদাহ বা ‘ন্যাশ’ (NASH)-এ রূপ নিতে শুরু করে, তার অন্তত ৬০ দিন বা দুই মাস আগে থেকেই শরীর চারটি বিশেষ সংকেত দিয়ে সতর্কবার্তা পাঠায়।

বর্তমানে আধুনিক জীবনযাত্রা ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের কারণে বাংলাদেশে ফ্যাটি লিভারের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। যকৃতের ওজনের ৫ থেকে ১০ শতাংশের বেশি চর্বি জমলে তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়। এটি কেবল স্থূল ব্যক্তিদের সমস্যা নয়, বরং আপাতদৃষ্টিতে রোগা মানুষেরও হতে পারে। লিভার বিশেষজ্ঞ বা হেপাটোলজিস্টদের মতে, এই রোগটি শুরুতে কোনো বড় উপসর্গ না দেখালেও, যকৃতের কোষগুলো যখন স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে, তার অন্তত দুই মাস আগে থেকেই শরীর তার অভ্যন্তরীণ সংকটের কথা জানান দেয়।

২ মাস আগে থেকে প্রকট হওয়া ৪টি প্রধান লক্ষণ

যকৃতের চারপাশে চর্বির আস্তরণ যখন তার স্বাভাবিক বিপাকীয় কাজকে ব্যাহত করে, তখন অন্তত আট সপ্তাহ আগে থেকেই নিচের পরিবর্তনগুলো পর্যায়ক্রমে দেখা দেয়:

  • পেটের ডান দিকের উপরিভাগে অস্বস্তি বা ভারি ভাব: এটি ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে সাধারণ আগাম লক্ষণ। পাঁজরের ঠিক নিচে যকৃতের অবস্থানে কোনো তীব্র ব্যথা না হলেও সারাক্ষণ একটি ‘ভারি ভাব’ বা অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে। ২ মাস আগে থেকেই রোগী পেট ভরা থাকার মতো এক ধরণের অস্বস্তিতে ভোগেন, যা মূলত যকৃতের আকার সামান্য বেড়ে যাওয়ার সংকেত।

  • বিরামহীন অবসাদ ও কাজে অনীহা: কোনো কঠোর পরিশ্রম ছাড়াই শরীর সারাক্ষণ ক্লান্ত থাকা ফ্যাটি লিভারের একটি স্নায়বিক বহিঃপ্রকাশ। যকৃৎ যখন চর্বির চাপে শরীরের বিষক্রিয়া বা ‘টক্সিন’ সরাতে ব্যর্থ হয়, তখন রক্তে শর্করার ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং মস্তিষ্কে ক্লান্তি অনুভূত হয়। এটি দুই মাস আগে থেকেই প্রকট হতে থাকে।

  • অকারণে ওজন কমে যাওয়া বা ক্ষুধামন্দা: জিম বা ডায়েট ছাড়াই যদি হঠাৎ ওজন কমতে শুরু করে এবং প্রিয় খাবারের প্রতিও অনীহা তৈরি হয়, তবে বুঝতে হবে যকৃৎ বিপাকে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। চর্বি জমার ফলে পরিপাকতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় এই লক্ষণটি দুই মাস আগে থেকেই উঁকি দেয়।

  • চোখ ও ত্বকের ফ্যাকাশে ভাব: জন্ডিস হওয়ার অনেক আগেই শরীর তার উজ্জ্বলতা হারাতে পারে। ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে রক্তশূন্যতা না থাকলেও ত্বক ও চোখের নিচে এক ধরণের ফ্যাকাসে বা নিস্প্রাণ ভাব লক্ষ্য করা যায়, যা যকৃতের ধীর গতির ইঙ্গিত।

ফ্যাটি লিভার সম্পর্কে কিছু জরুরি তথ্য

এই রোগের গভীরতা ও এর ঝুঁকি বুঝতে নিচের তথ্যগুলো অত্যন্ত সহায়ক হতে পারে:

  • প্রধান ঝুঁকির কারণ: অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং পেটে অতিরিক্ত মেদ (ভিসারাল ফ্যাট) থাকা।

  • শনাক্তকরণ: কেবল রক্ত পরীক্ষায় এটি ধরা নাও পড়তে পারে; লিভারের সঠিক অবস্থা বুঝতে ‘আল্ট্রাসনোগ্রাম’ (USG) বা ‘ফাইব্রোস্ক্যান’ পরীক্ষা জরুরি।

  • জটিলতা: সময়মতো প্রতিকার না করলে এটি ‘লিভার সিরোসিস’ এবং এমনকি ‘লিভার ক্যান্সার’ পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে।

প্রতিকার ও সচেতনতা

ফ্যাটি লিভার থেকে মুক্তির প্রধান উপায় হলো জীবনযাত্রার আমূল পরিবর্তন। দিনে অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা এবং শর্করা ও চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা যকৃতের চর্বি কমাতে জাদুর মতো কাজ করে। চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো—দুই মাস আগে থেকে পাওয়া এই লক্ষণগুলোকে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া এবং শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা।

যকৃৎ শরীরের একটি অত্যন্ত সহনশীল অঙ্গ, যা সহজে অভিযোগ করে না। কিন্তু যখন সে দুই মাস আগে থেকে অস্বস্তি ও ক্লান্তির মাধ্যমে সংকেত পাঠায়, তখন সেই আর্তনাদকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। জনসচেতনতা এবং সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয়ই পারে ফ্যাটি লিভারের মতো নীরব ঘাতককে রুখে দিতে। মনে রাখবেন, যকৃৎ সুস্থ থাকলে আপনিও থাকবেন প্রাণবন্ত।

Leave A Comment