x
d o c t o r s 2 4
কোবাল্ট বা ভিটামিন B12 ঘাটতির ৬ মাস আগে যেসব লক্ষণ প্রকাশ পায়
27 Feb

কোবাল্ট (Cobalt) আমাদের শরীরের জন্য একটি অতি প্রয়োজনীয় ট্রেস মিনারেল বা স্বল্পমাত্রার খনিজ, যার প্রধান কাজ হলো ভিটামিন B12 (সায়ানোকোবালামিন) তৈরি করা। এটি ছাড়া লোহিত রক্তকণিকা গঠন এবং স্নায়ুর সুরক্ষা অসম্ভব। যেহেতু লিভারে ভিটামিন B12 দীর্ঘ সময় সঞ্চিত থাকে, তাই কোবাল্টের ঘাটতি হুট করে বোঝা যায় না। তবে শরীরের অভ্যন্তরীণ ভাণ্ডার যখন শেষের পথে থাকে, তখন চূড়ান্ত রক্তশূন্যতা হওয়ার প্রায় ৬ মাস আগে থেকেই শরীর কিছু সতর্ক সংকেত দিতে শুরু করে।

মানবদেহে রক্ত তৈরি এবং ডিএনএ (DNA) সিন্থেসিসের মূল কারিগর হলো কোবাল্ট। চিকিৎসকদের মতে, যারা বিশুদ্ধ নিরামিষাশী (Vegan) অথবা যাদের পরিপাকতন্ত্রে শোষণের সমস্যা রয়েছে, তাদের শরীরে কোবাল্টের অভাব হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এটি মূলত ভিটামিন B12-এর অবিচ্ছেদ্য অংশ।

শরীর যখন পর্যাপ্ত কোবাল্ট পায় না, তখন লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদন ব্যাহত হয়। এই ঘাটতি মারাত্মক আকার ধারণ করার অন্তত ৬ মাস আগে থেকেই শরীর ৬টি বিশেষ লক্ষণ প্রকাশ করে।

নিচে সেই লক্ষণগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. জিহ্বার উপরিভাগ মসৃণ হয়ে যাওয়া (Glossitis)

কোবাল্ট বা B12-এর অভাব শুরু হলে জিহ্বার স্বাভাবিক লালচে ভাব এবং ছোট ছোট দানাগুলো (Papillae) হারিয়ে যেতে থাকে। ৬ মাস আগে থেকেই আপনি লক্ষ্য করতে পারেন যে আপনার জিহ্বা অস্বাভাবিক মসৃণ, চকচকে এবং মাঝেমধ্যে ফুলে লাল হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে খাবারের স্বাদ পেতেও সমস্যা হতে পারে।

২. হাত ও পায়ে বিদ্যুতের মতো ঝিলিক দেওয়া (Electric Shock Sensation)

কোবাল্টের অভাবে স্নায়ুর সুরক্ষামূলক আবরণ ‘মায়েলিন শিথ’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে ৬ মাস আগে থেকেই আপনি অনুভব করতে পারেন যে হাত বা পায়ের আঙুলে হঠাৎ বিদ্যুতের মতো মৃদু ঝিলিক দিচ্ছে। এটি সাধারণ ঝিনঝিন করার চেয়ে কিছুটা আলাদা এবং যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে।

৩. অকারণে স্মৃতিভ্রম বা ভুলে যাওয়া (Brain Fog)

মস্তিষ্কের তীক্ষ্ণতা বজায় রাখতে কোবাল্ট অপরিহার্য। ঘাটতি শুরুর প্রাথমিক মাসগুলোতে আপনি লক্ষ্য করবেন যে আপনি খুব সাধারণ বিষয় ভুলে যাচ্ছেন বা কথা বলার সময় সঠিক শব্দ খুঁজে পাচ্ছেন না। এই ‘ব্রেন ফগ’ পরিস্থিতি নির্দেশ করে যে আপনার স্নায়বিক সঞ্চয় কমে আসছে।

৪. ত্বকের বিবর্ণতা বা ফ্যাকাসে হলুদ ভাব (Pale or Jaundiced Skin)

লোহিত রক্তকণিকা যখন কোবাল্টের অভাবে ঠিকমতো তৈরি হতে পারে না, তখন সেগুলো ভঙ্গুর হয়ে যায় এবং বিলিরুবিন নামক রঞ্জক পদার্থ তৈরি করে। এর ফলে ৬ মাস আগে থেকেই আপনার ত্বক স্বাভাবিক জেল্লা হারিয়ে ফ্যাকাসে বা হালকা হলুদাভ দেখাতে পারে। অনেকে একে জন্ডিস মনে করেন, কিন্তু এটি আসলে রক্তাল্পতার সংকেত।

৫. শ্বাস-প্রশ্বাসে ঘনঘন হাঁপিয়ে ওঠা

রক্তে পর্যাপ্ত সুস্থ লোহিত রক্তকণিকা না থাকলে হৃদপিণ্ড এবং ফুসফুসকে সারা শরীরে অক্সিজেন পৌঁছাতে দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হয়। ৬ মাস আগে থেকেই আপনি লক্ষ্য করবেন যে সামান্য দ্রুত হাঁটলে বা সিঁড়ি দিয়ে একতলা উপরে উঠলে বুক ধড়ফড় করছে এবং দম নিতে কষ্ট হচ্ছে।

৬. অস্বাভাবিক মেজাজ পরিবর্তন ও উদ্বেগ (Anxiety)

কোবাল্ট মস্তিষ্কের ‘সেরোটোনিন’ এবং ‘ডোপামিন’ নামক হরমোন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এর মাত্রা কমতে থাকলে কোনো বাহ্যিক কারণ ছাড়াই প্রচণ্ড মন খারাপ, উদ্বেগ বা খিটখিটে মেজাজ তৈরি হতে পারে। এই পরিবর্তনটি খুব ধীরগতিতে শুরু হয় বলে অনেকেই একে গুরুত্ব দেন না।

কোবাল্ট ও পাকস্থলীর সম্পর্ক

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কোবাল্ট সরাসরি গ্রহণ করলেই তা কাজে লাগে না। পাকস্থলীতে ‘ইনট্রিনসিক ফ্যাক্টর’ (Intrinsic Factor) নামক এক ধরনের প্রোটিন থাকতে হয় যা কোবাল্ট বা B12 শোষণে সাহায্য করে। তাই আপনার ডায়েট ঠিক থাকলেও যদি পাকস্থলীতে এসিডিটি বা গ্যাস্ট্রাইটিসের সমস্যা থাকে, তবে আপনি ৬ মাস আগেই এই ঘাটতিতে পড়তে পারেন।

কোবাল্টের উৎস ও প্রতিকার

কোবাল্ট সাধারণত ভিটামিন B12 সমৃদ্ধ খাবারের মাধ্যমেই শরীরে প্রবেশ করে:

  • সামুদ্রিক মাছ: টুনা, স্যামন এবং বিভিন্ন লোনা জলের মাছ।

  • মাংস ও কলিজা: কোবাল্টের সবচেয়ে সমৃদ্ধ উৎস।

  • দুধ ও পনির: নিরামিষাশীদের জন্য ডেইরি পণ্য অত্যন্ত জরুরি।

  • গাঁজানো খাবার: কিমচি বা প্রাকৃতিকভাবে গাঁজানো খাবার অন্ত্রে শোষণে সাহায্য করে।

বিশেষ পরামর্শ: নিরামিষাশীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কোবাল্ট বা B12 সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়, কারণ উদ্ভিজ্জ খাবারে এর পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য।

Leave A Comment