আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো — ফাইটোকেমিক্যালস (Phytochemicals)। নাম শুনে মনে হতে পারে এটি কোনো কৃত্রিম রাসায়নিক উপাদান, কিন্তু আসলে ফাইটোকেমিক্যাল হলো উদ্ভিদে স্বাভাবিকভাবে থাকা প্রাকৃতিক যৌগ, যা শরীরকে নানা রোগ থেকে রক্ষা করে, বিশেষত ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রকৃতি আমাদের জন্য এক বিশাল “ওষুধের ভাণ্ডার” তৈরি করে রেখেছে, যা প্রতিদিনের খাদ্য থেকেই পাওয়া যায় — যেমন ফল, শাকসবজি, ডাল, মসলা, ও শস্যদানা। এই প্রাকৃতিক যৌগগুলো শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, কোষের ক্ষতি প্রতিরোধ করে এবং ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে।
ফাইটোকেমিক্যাল কীভাবে কাজ করে?
ফাইটোকেমিক্যালস আসলে শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে রক্ষা করে। আমাদের শরীরে প্রতিনিয়ত ফ্রি র্যাডিক্যাল নামে ক্ষতিকর অণু তৈরি হয়, যা কোষের DNA ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ক্যান্সারের সূচনা ঘটাতে পারে।
ফাইটোকেমিক্যাল এই ফ্রি র্যাডিক্যালগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে, কোষের ক্ষয় রোধ করে এবং ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে।
এছাড়া কিছু ফাইটোকেমিক্যাল যেমন ফ্ল্যাভোনয়েড, ক্যারোটিনয়েড, গ্লুকোসিনোলেট ও পলিফেনলস ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি ও বিস্তার বন্ধ করতে সক্ষম বলে গবেষণায় প্রমাণিত।
কোন খাবারে পাওয়া যায় ফাইটোকেমিক্যাল
বিভিন্ন রঙের ফল ও সবজিতে ফাইটোকেমিক্যালের আধিক্য ভিন্ন ভিন্ন রূপে থাকে।
চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদরা বলেন, “রঙিন প্লেট মানেই স্বাস্থ্যকর প্লেট।”
নিচে কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো—
- লাল রঙের ফল ও সবজি (টমেটো, তরমুজ, পেয়ারা):
এতে থাকে লাইকোপেন (Lycopene), যা প্রোস্টেট, ফুসফুস ও পাকস্থলীর ক্যান্সার প্রতিরোধে কার্যকর। - কমলা ও হলুদ রঙের ফল (গাজর, কুমড়া, কমলা, আম):
এতে থাকা বিটা-ক্যারোটিন ও ফ্ল্যাভোনয়েডস কোষের DNA রক্ষা করে। - সবুজ শাকসবজি (ব্রকলি, পালং, বাঁধাকপি):
এগুলোতে গ্লুকোসিনোলেটস থাকে, যা ক্যান্সার কোষের এনজাইম কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। - বেগুনি ও নীল ফল (ব্লুবেরি, আঙুর, বেগুন):
এতে থাকা অ্যান্থোসায়ানিন প্রদাহ ও কোষ ক্ষয় রোধ করে। - মসলা ও হার্বস (হলুদ, আদা, রসুন):
কারকিউমিন ও অ্যালিসিন নামের ফাইটোকেমিক্যাল ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি ধীর করে দেয়।
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব মানুষ প্রতিদিন অন্তত পাঁচ রঙের শাকসবজি ও ফল খান, তাদের মধ্যে ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রায় ৪০% কম।
এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় ফল যেমন পেয়ারা, আমড়া, কাঁচা পেঁপে, কলা ও লালশাকেও প্রচুর ফাইটোকেমিক্যাল রয়েছে, যা ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক।
ফাইটোকেমিক্যাল গ্রহণের সঠিক উপায়
- প্রতিদিনের খাবারে ৫ ধরনের রঙের ফল ও সবজি রাখুন।
- কাঁচা বা হালকা সিদ্ধ অবস্থায় খেলে ফাইটোকেমিক্যাল বেশি কার্যকর থাকে।
- অতিরিক্ত তেল বা লবণ দিয়ে রান্না করলে উপকারিতা অনেক কমে যায়।
- প্রক্রিয়াজাত খাবার ও কোমল পানীয় পরিহার করুন।
