সম্প্রতি কানাডার নর্থ ভ্যাঙ্কুভারের বাসিন্দা ব্রেন্ট চ্যাপম্যানের জীবন বদলে গেছে একটি বিরল চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে। ১৩ বছর বয়সে দৃষ্টি হারানোর পর ২০ বছরেরও বেশি সময় অন্ধত্বের অন্ধকারে কাটানোর পর, ৩৪ বছর বয়সী চ্যাপম্যান আবার দেখতে শুরু করেছেন। এই অসাধারণ সাফল্যের পিছনে রয়েছে “টুথ-ইন-আই” সার্জারি, যেখানে রোগীর নিজের দাঁত ব্যবহার করে চোখে লেন্স ইমপ্লান্ট করা হয়। এই পদ্ধতি বিশ্বব্যাপী মাত্র কয়েকশোবারই সফল হয়েছে, এবং এটি গুরুতর কর্নিয়া ক্ষতির কারণে অন্ধ হয়ে যাওয়া রোগীদের জন্য শেষ আশার দিগন্ত।
চ্যাপম্যানের অন্ধত্বের কারণ ছিল ইবুপ্রোফেনের প্রতি একটি অত্যন্ত বিরল অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া, যা স্টিভেন্স-জনসন সিন্ড্রোম (SJS) নামে পরিচিত। এই গুরুতর অটোইমিউন রোগ ত্বক, শ্লেষ্মা ঝিল্লি এবং চোখের কর্নিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, ফলে উভয় চোখেই দৃষ্টি সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়। SJS-এর কারণে কর্নিয়ায় গুরুতর ক্ষত এবং দৃষ্টিনষ্টি ঘটে, যা সাধারণ চিকিৎসায় সারানো কঠিন। চ্যাপম্যান বহু বছর বিভিন্ন চিকিৎসা চেষ্টা করলেও কোনো সাফল্য পাননি, যত পর্যন্ত তিনি ভ্যাঙ্কুভারের প্রোভিডেন্স হেলথ কেয়ারের মাউন্ট সেন্ট জোসেফ হাসপাতালে চোখের বিশেষজ্ঞ ডা. গ্রেগ মোলোনির সঙ্গে যোগাযোগ করেন না।
টুথ-ইন-আই সার্জারি: বিজ্ঞানের অলৌকিকতা
এই পদ্ধতিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে Osteo-Odonto-Keratoprosthesis (OOKP) বলা হয়। ১৯৬০-এর দশকে ইতালির চিকিৎসক ডা. বেনেডেত্তো বিস্কিয়ের দ্বারা উদ্ভাবিত এই জটিল অস্ত্রোপচারটি সাধারণ কর্নিয়া ট্রান্সপ্লান্টের বিকল্প, যখন রোগীর কর্নিয়া অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অন্যান্য ট্রান্সপ্লান্ট কাজ করে না। এই সার্জারিতে রোগীর নিজের টিস্যু ব্যবহার করা হয়, যা প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকি কমায় এবং দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য নিশ্চিত করে। বিশ্বব্যাপী এই অপারেশন মাত্র ১০০-২০০ বারই সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, এবং এটি সাধারণত ৬-১২ মাসের একাধিক ধাপ নিয়ে চলে।
সার্জারির ধাপসমূহ
- প্রথম ধাপ: চোখের ক্ষতিগ্রস্ত কর্নিয়া অংশ অপসারণ করা হয় এবং গালের ভিতরের টিস্যু (mucosa) দিয়ে এটি আচ্ছাদিত করা হয়। এটি একটি স্বাস্থ্যকর ভিত্তি তৈরি করে, যা পরবর্তী ইমপ্লান্টের জন্য প্রস্তুত করে।
- দাঁত সংগ্রহ ও প্রস্তুতি: রোগীর একটি ক্যানাইন দাঁত (সাধারণত unicuspid) এবং সংলগ্ন হাড়ের অংশ নেওয়া হয়। দাঁতটি আকার দেওয়া হয় এবং এতে একটি বিশেষ অপটিক্যাল সিলিকন লেন্স (optical cylinder) বসানো হয়। এই লেন্সটি আলো প্রবেশ করতে সাহায্য করে।
- ইন্টিগ্রেশন ফেজ: দাঁত-লেন্স সংমিশ্রণটি ২-৪ মাসের জন্য রোগীর গালের টিস্যুর নিচে রাখা হয়। এই সময়ে নতুন রক্তনালী গঠিত হয়, যা ইমপ্লান্টকে জীবিত রাখে এবং এটিকে চোখের জন্য প্রস্তুত করে।
- চূড়ান্ত ইমপ্লান্টেশন: কয়েক মাস পর এই সংমিশ্রণটি চোখে স্থাপিত করা হয়। দাঁতের হাড়ের অংশ চোখের স্ক্লেরা (সাদা অংশ) এবং টিস্যুর সাথে একীভূত হয়, যা লেন্সকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখে। এর ফলে রোগী আলো এবং আকার দেখতে পান, এবং কিছু ক্ষেত্রে রঙও।
এই পদ্ধতির সাফল্যের হার প্রায় ৮০-৯০%, এবং এটি জীবনকাল ধরে কাজ করে। তবে এটি শুধুমাত্র গুরুতর কর্নিয়াল অন্ধত্বের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, যেমন রাসায়নিক পোড়া, SJS বা অটোইমিউন রোগের কারণে।
