রক্তনালীর এক বিরল ও রহস্যময় প্রদাহজনিত রোগ ‘তাকায়াসু আর্থ্রাইটিস’। হৃৎপিণ্ড থেকে সারা শরীরে রক্ত সরবরাহকারী প্রধান ধমনী ‘অ্যাওর্টা’ আক্রান্ত হওয়ায় একে ‘পালসলেস ডিজিজ’ বা নাড়ির স্পন্দনহীন রোগও বলা হয়। চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন, চূড়ান্ত স্ট্রোক বা হৃদরোগের অন্তত ৬ মাস আগে থেকেই শরীর ৫টি বিশেষ সংকেত দিতে শুরু করে।
তাকায়াসু আর্থ্রাইটিস (Takayasu’s Arteritis) মূলত শরীরের প্রধান ধমনীগুলোতে প্রদাহ তৈরি করে সেগুলোকে সংকুচিত বা সরু করে দেয়। এর ফলে শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে রক্ত সঞ্চালন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। সাধারণত এশীয় অঞ্চলের তরুণীদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ বেশি দেখা গেলেও সঠিক সচেতনতার অভাবে রোগটি নির্ণয় করতে অনেক দেরি হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রোগটি হঠাৎ করে জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দেয় না; বরং এটি ছয় মাস ধরে শরীরকে ধাপে ধাপে সতর্ক করে।
৬ মাস আগে থেকে শরীরে ফুটে ওঠা ৫টি প্রধান লক্ষণ
রিউমাটোলজিস্ট এবং ভাসকুলার সার্জনদের মতে, রোগের দ্বিতীয় পর্যায়ে বা রক্তনালী সরু হওয়ার অন্তত ১৮০ দিন আগে থেকেই নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিতে থাকে:
-
দুই হাতের রক্তচাপে অস্বাভাবিক পার্থক্য: এটি এই রোগের সবচেয়ে ধ্রুপদী লক্ষণ। ছয় মাস আগে থেকেই আক্রান্ত ব্যক্তি লক্ষ্য করতে পারেন যে, তার ডান হাত ও বাম হাতের রক্তচাপের মধ্যে ১০ থেকে ২০ ইউনিটের বেশি পার্থক্য থাকছে। এক হাতের নাড়ির স্পন্দন বা পালস অন্য হাতের তুলনায় অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে আসে।
-
হাত ও পায়ে হঠাৎ তীব্র ক্লান্তি বা পেশিতে ব্যথা: সামান্য হাঁটাচলা করলে পায়ে ব্যথা হওয়া কিংবা হাত তুলে কোনো কাজ করলে (যেমন কাপড় নাড়া বা চুল আঁচড়ানো) হাত দ্রুত অবশ হয়ে আসা। রক্তনালী সরু হওয়ার কারণে পেশিতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পৌঁছানোয় এই ‘ক্লডিকেশন’ বা যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়।
-
মাথা ঘোরা ও হঠাৎ দৃষ্টিবিভ্রাট: শরীরের উপরের দিকে রক্ত সরবরাহ কমে যাওয়ায় রোগী প্রায়ই মাথা ঘোরানো (Dizziness) বা ভারসাম্যহীনতায় ভোগেন। অনেক সময় হঠাৎ করে চোখের সামনে অন্ধকার দেখা বা দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া—যা অন্তত ৬ মাস আগে থেকেই অনিয়মিতভাবে শুরু হতে পারে।
-
অকারণ ক্লান্তি ও দীর্ঘস্থায়ী মৃদু জ্বর: কোনো বিশেষ সংক্রমণ ছাড়াই শরীরের তাপমাত্রা ৯৯-১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের আশেপাশে থাকা এবং সারাক্ষণ অবসন্ন বোধ করা। শরীর যখন ধমনীর ভেতরে প্রদাহের বিরুদ্ধে লড়াই করে, তখন এই সিস্টেমিক লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়।
-
বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট: ধমনীর গোড়ায় প্রদাহ থাকলে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় বা দ্রুত হাঁটলে বুকে চাপ অনুভূত হয়। অনেক সময় এই ব্যথা ঘাড় বা চোয়ালের দিকেও ছড়িয়ে যেতে পারে, যা অনেকেই সাধারণ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা ভেবে ভুল করেন।
রোগ নির্ণয় ও কিছু জরুরি তথ্য
তাকায়াসু আর্থ্রাইটিস সম্পর্কে জনস্বাস্থ্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
-
আক্রান্তের বয়স: সাধারণত ১৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে এই রোগের হার প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ।
-
শনাক্তকরণ: সিটি এনজিওগ্রাম (CT Angiogram) বা এমআরআই (MRI) পরীক্ষার মাধ্যমে ধমনীর সংকীর্ণতা পরীক্ষা করে এই রোগ নিশ্চিত করা হয়।
-
জটিলতা: সময়মতো চিকিৎসা না করলে এটি উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট ফেইলিওর এবং এমনকি অকাল স্ট্রোকের কারণ হতে পারে।
প্রতিকার ও সচেতনতা
তাকায়াসু আর্থ্রাইটিস একটি দীর্ঘমেয়াদী রোগ হলেও আধুনিক স্টেরয়েড থেরাপি এবং ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধের মাধ্যমে একে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে ধমনী বেশি সরু হয়ে গেলে রিং পরানো বা বাইপাস সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় প্রতিকার হলো সময়মতো উপসর্গ শনাক্ত করা। তরুণীদের মধ্যে যদি দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি এবং এক হাতের পালস দুর্বল মনে হয়, তবে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আমাদের শরীরের প্রতিটি ধমনী হলো প্রাণের স্পন্দন। তাকায়াসু আর্থ্রাইটিসের মতো রোগ সেই স্পন্দনকেই স্তব্ধ করে দিতে চায়। তবে শরীর যখন ছয় মাস আগে থেকে বারবার সংকেত পাঠায়, তখন তাকে অগ্রাহ্য করা আত্মঘাতী হতে পারে। জনসচেতনতা এবং সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয়ই পারে এই বিরল রোগের হাত থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে।
