x
d o c t o r s 2 4
26 Jan

শরীরের মাঝারি ও ক্ষুদ্র ধমনীগুলোকে আক্রমণকারী এক বিরল অথচ প্রাণঘাতী রোগ ‘পলিআর্টেরাইটিস নোডোসা’ (PAN)। রক্তনালীর এই প্রদাহ সময়মতো শনাক্ত না হলে কিডনি, অন্ত্র এবং স্নায়ুতন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, চূড়ান্ত শারীরিক বিপর্যয়ের অন্তত ৩০ দিন আগে থেকেই শরীর ৬টি বিশেষ লক্ষণের মাধ্যমে সতর্কবার্তা দেয়।

পলিআর্টেরাইটিস নোডোসা মূলত একটি ‘সিস্টেমিক ভাসকুলাইটিস’। এটি শরীরের রক্তনালীগুলোকে দুর্বল ও ক্ষতিগ্রস্ত করে দেয়, যার ফলে অঙ্গে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে টিস্যু মৃত্যু বা ‘ইনফার্কশন’ ঘটতে পারে। বাংলাদেশে এই রোগটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা অত্যন্ত সীমিত। অথচ চিকিৎসকরা বলছেন, হেপাটাইটিস-বি আক্রান্ত ব্যক্তি এবং নির্দিষ্ট বয়সের মানুষের মধ্যে এই রোগের ঝুঁকি বেশি থাকে। রোগের পূর্ণ আক্রমণের এক মাস আগে থেকেই শরীর তার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা প্রকাশ করতে শুরু করে।

১ মাস আগে শরীরে প্রকট হওয়া ৬টি প্রধান লক্ষণ

রিউমাটোলজিস্ট ও রক্তরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, পলিআর্টেরাইটিস নোডোসা চূড়ান্ত রূপ নেওয়ার অন্তত চার সপ্তাহ আগে নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে:

  • ত্বকে জালের মতো নীলচে নকশা ও চাকা: এক মাস আগে থেকেই হাত বা পায়ের ত্বকে বেগুনি বা লালচে জালের মতো দাগ (Livedo Reticularis) দেখা দেয়। অনেক সময় ত্বকের নিচে ছোট ছোট ব্যথাদায়ক চাকা বা গুটি অনুভূত হতে পারে, যা আসলে ধমনীর প্রদাহের বহিঃপ্রকাশ।

  • খাবার খাওয়ার পর পেটে তীব্র ব্যথা: এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। অন্ত্রের ধমনীতে প্রদাহ শুরু হলে রোগী খাবার খাওয়ার ৩০ থেকে ৬০ মিনিটের মধ্যে পেটে অসহ্য মোচড় দেওয়া ব্যথা অনুভব করেন। একে ‘মেসেন্টেরিক এনজাইনা’ বলা হয়।

  • পেশি ও জয়েন্টে বিরামহীন যন্ত্রণা: কোনো চোট ছাড়াই হাত-পা এবং পিঠের পেশিতে তীব্র ব্যথা অনুভূত হওয়া। বিশেষ করে রাতের বেলা এই ব্যথা বৃদ্ধি পায় এবং শরীর আড়ষ্ট হয়ে থাকে।

  • হাত-পায়ের আঙুলে অবশ ভাব বা ‘ড্রপ’: এক মাস আগে থেকেই হঠাৎ করে হাত বা পায়ের পাতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে (Foot Drop or Wrist Drop)। স্নায়ু সরবরাহকারী রক্তনালীগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে আঙুলে ঝিঁঝিঁ ধরা বা অবশ হয়ে যাওয়ার মতো স্নায়বিক সমস্যা দেখা দেয়।

  • অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ: যাদের আগে কখনো রক্তচাপের সমস্যা ছিল না, তাদের ক্ষেত্রেও হঠাৎ করে উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিতে পারে। এটি কিডনির ধমনীতে প্রদাহের একটি প্রাথমিক লক্ষণ।

  • অকারণ ক্লান্তি ও রাতে শরীর ঘামা: কোনো বিশেষ পরিশ্রম ছাড়াই সারাক্ষণ অবসন্ন বোধ করা এবং রাতের বেলা ঘুমানোর সময় অস্বাভাবিকভাবে ঘাম হওয়া। শরীর যখন ধমনীর ভেতরের ক্ষতের বিরুদ্ধে লড়ে, তখন এই ধরণের সিস্টেমিক লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়।

পলিআর্টেরাইটিস নোডোসা সম্পর্কে কিছু জরুরি তথ্য

এই রোগের ভয়াবহতা ও বিস্তৃতি বুঝতে নিচের তথ্যগুলো সহায়ক হতে পারে:

  • হেপাটাইটিস সংযোগ: পলিআর্টেরাইটিস নোডোসায় আক্রান্তদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্ত থাকেন। ভাইরাসের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিক্রিয়া অনেক সময় এই রোগের জন্ম দেয়।

  • বয়স ও লিঙ্গ: এটি সাধারণত ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, তবে যেকোনো বয়সেই হানা দিতে পারে। নারীদের তুলনায় পুরুষদের আক্রান্ত হওয়ার হার কিছুটা বেশি।

  • সনাক্তকরণ: রক্ত পরীক্ষায় প্রদাহের মাত্রা (ESR, CRP) দেখা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গের ‘এনজিওগ্রাম’ বা ‘বায়োপসি’র মাধ্যমে এই রোগ নিশ্চিত করা হয়।

প্রতিকার ও সচেতনতা

পলিআর্টেরাইটিস নোডোসার চিকিৎসা জটিল হলেও আধুনিক ইমিউনোসাপ্রেসিভ থেরাপি এবং স্টেরয়েড ব্যবহারের মাধ্যমে রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ রাখা সম্ভব। তবে ট্র্যাজেডি হলো, এক মাস আগে থেকে পাওয়া এই লক্ষণগুলোকে অনেকেই সাধারণ গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা বা চর্মরোগ ভেবে ভুল করেন। চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো—পেটে ব্যথা, ত্বকের নীলচে দাগ এবং উচ্চ রক্তচাপ একসাথে দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

রক্তনালী হলো শরীরের প্রাণশক্তি। সেখানে পলিআর্টেরাইটিস নোডোসার মতো রোগ বাসা বাঁধা মানে পুরো জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। এক মাস আগে থেকে পাওয়া এই সংকেতগুলো অবহেলা না করে দ্রুত রোগ নির্ণয় করতে পারলে অঙ্গহানি এবং অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব। সচেতনতাই হোক এই জটিল রোগের বিরুদ্ধে আমাদের প্রথম ঢাল।

Leave A Comment