শরীরে রক্তের পরিমাণ ও ঘনত্ব স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে তাকে বলা হয় পলিসাইথেমিয়া (Polycythemia)। এই অবস্থায় বিশেষ করে লোহিত রক্তকণিকা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, ফলে রক্ত ঘন হয়ে পড়ে এবং হৃদ্যন্ত্র, মস্তিষ্ক ও রক্তনালিতে মারাত্মক জটিলতার ঝুঁকি তৈরি হয়। চিকিৎসকদের মতে, পলিসাইথেমিয়া হঠাৎ ধরা পড়ে না; বরং রোগ শনাক্ত হওয়ার প্রায় ৩ মাস আগেই শরীর কিছু স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিতে শুরু করে, যেগুলো আমরা সাধারণ দুর্বলতা বা আবহাওয়ার প্রভাব ভেবে এড়িয়ে যাই।
বাংলাদেশের মতো গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এই রোগের প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় আরও বিভ্রান্তিকর হয়। তাই সময়মতো লক্ষণ চেনা অত্যন্ত জরুরি। নিচে তুলে ধরা হলো পলিসাইথেমিয়ার ৩ মাস আগে শরীরে দেখা দেওয়া ৬টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ, সঙ্গে থাকছে নতুন চিকিৎসা তথ্য।
১. মাথাব্যথা ও মাথা ঘোরা
পলিসাইথেমিয়ার অন্যতম প্রাথমিক লক্ষণ হলো ঘন ঘন মাথাব্যথা।
- হালকা থেকে মাঝারি মাথাব্যথা
- হঠাৎ মাথা ঘোরা বা ভারী লাগা
- দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকলে সমস্যা বাড়ে
রক্ত অতিরিক্ত ঘন হয়ে গেলে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ ধীর হয়, ফলে “মাইক্রোসার্কুলেশন ডিসঅর্ডার” তৈরি হয়—এটাই মাথাব্যথার প্রধান কারণ।
২. ত্বক লালচে বা বেগুনি ভাব
এই রোগে ত্বকের রঙে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যায়।
- মুখ, হাত ও পায়ে লালচে বা নীলচে আভা
- গরমে রঙ আরও গাঢ় হয়ে ওঠে
- আয়নায় তাকালে ত্বক অস্বাভাবিক উজ্জ্বল দেখায়
গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত লোহিত রক্তকণিকা ত্বকের ছোট রক্তনালিতে জমে এই রঙ পরিবর্তনের সৃষ্টি করে।
৩. গোসলের পর তীব্র চুলকানি
পলিসাইথেমিয়ার একটি বিশেষ লক্ষণ হলো পানির সংস্পর্শে এলেই চুলকানি।
- গরম পানিতে গোসলের পর বেশি চুলকায়
- কোনো ফুসকুড়ি ছাড়াই চুলকানি
- চুলকানি দীর্ঘ সময় স্থায়ী হতে পারে
চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে “অ্যাকোয়াজেনিক প্রুরিটাস” বলা হয়, যা পলিসাইথেমিয়া ভেরার একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস।
৪. অতিরিক্ত ঘাম ও শ্বাসকষ্ট
রক্ত ঘন হয়ে গেলে শরীরের অক্সিজেন পরিবহন ব্যাহত হয়।
- সামান্য কাজেই শ্বাস নিতে কষ্ট
- রাতে অতিরিক্ত ঘাম
- বুক ধড়ফড় করা
আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই অবস্থায় হৃদ্যন্ত্রকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়, ফলে এসব উপসর্গ দেখা দেয়।
৫. হাত-পা ঝিনঝিন বা জ্বালাপোড়া
অনেক রোগী শুরুতে স্নায়বিক সমস্যা অনুভব করেন।
- আঙুলে ঝিনঝিন ভাব
- হাত-পা জ্বালাপোড়া বা অবশ লাগা
- ঠান্ডা-গরম অনুভূতিতে পরিবর্তন
অতিরিক্ত ঘন রক্ত স্নায়ুর ক্ষুদ্র রক্তনালিতে রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয়, যা এই উপসর্গ তৈরি করে।
৬. অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও মনোযোগের অভাব
৩ মাস আগেই শরীরের শক্তি কমতে শুরু করে।
- পর্যাপ্ত ঘুমের পরও ক্লান্তি
- কাজে মন বসাতে কষ্ট
- স্মৃতিশক্তি দুর্বল মনে হওয়া
গবেষণায় দেখা যায়, রক্তের ঘনত্ব বাড়লে মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ কমে গিয়ে মানসিক কর্মক্ষমতা প্রভাবিত হয়।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
- একাধিক লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দিলে
- গোসলের পর নিয়মিত চুলকানি হলে
- মাথাব্যথার সঙ্গে ত্বকের রঙ পরিবর্তন হলে
এক্ষেত্রে দ্রুত রক্ত পরীক্ষা (CBC, হেমাটোক্রিট) ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ জরুরি।
পলিসাইথেমিয়া একটি নীরব কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ রক্তজনিত রোগ। শরীর ৩ মাস আগেই সতর্ক সংকেত দেয়—এই ৬টি লক্ষণ সঠিকভাবে চিনতে পারলে সময়মতো চিকিৎসা নিয়ে স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাকসহ গুরুতর জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
