x
d o c t o r s 2 4
08 Sep

পিত্তথলির পাথর বা গলস্টোন হলো পিত্তথলিতে সৃষ্ট শক্ত কণা, যা পিত্তরসের উপাদান (কোলেস্টেরল বা বিলিরুবিন) জমাট বেঁধে তৈরি হয়। এটি একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা, যা বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রভাবিত করে। পিত্তথলি একটি ছোট অঙ্গ, যা লিভারের নিচে অবস্থিত এবং খাবার হজমে সহায়ক পিত্তরস সঞ্চয় করে। পাথর সৃষ্টি হলে তা তীব্র ব্যথা বা জটিলতার কারণ হতে পারে। এই নিবন্ধে আমরা পিত্তথলির পাথরের লক্ষণ, ঝুঁকির কারণ এবং অস্ত্রোপচারের বিকল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

পিত্তথলির পাথর কী?

পিত্তথলির পাথর হলো কোলেস্টেরল, বিলিরুবিন বা ক্যালসিয়াম লবণের শক্ত জমাট, যার আকার কয়েক মিলিমিটার থেকে কয়েক সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এটি কোনো লক্ষণ সৃষ্টি করে না (নীরব পাথর), তবে পাথর যখন পিত্তনালীতে আটকে যায়, তখন তীব্র ব্যথা বা সংক্রমণ হতে পারে। পাথরের ধরন দুটি: কোলেস্টেরল পাথর (৮০%) এবং পিগমেন্ট পাথর (বিলিরুবিন জাতীয়)।

পিত্তথলির পাথরের লক্ষণ

অনেকের ক্ষেত্রে পিত্তথলির পাথর কোনো উপসর্গ সৃষ্টি করে না, তবে যখন পাথর পিত্তনালীতে বাধা সৃষ্টি করে, তখন নিম্নলিখিত লক্ষণ দেখা দিতে পারে:

  • তীব্র পেটে ব্যথা: ডান দিকের উপরের পেটে বা মাঝখানে তীব্র ব্যথা, যা কাঁধে ছড়াতে পারে (গলব্লাডার অ্যাটাক)।
  • বমি বা বমিভাব: চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর ব্যথার সাথে বমি।
  • জ্বর ও কাঁপুনি: সংক্রমণ বা প্রদাহের কারণে (কোলেসিস্টাইটিস)।
  • জন্ডিস: পিত্তনালী বন্ধ হলে ত্বক ও চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া।
  • পরিপাক সমস্যা: ফোলাভাব, অম্বল বা গ্যাস।
  • মল বা মূত্রের রঙের পরিবর্তন: ফ্যাকাশে মল বা গাঢ় মূত্র।

লক্ষণগুলো সাধারণত খাওয়ার পর, বিশেষ করে ভারী বা তৈলাক্ত খাবারের পর তীব্র হয়।

ঝুঁকির কারণ

পিত্তথলির পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায় এমন কিছু কারণ:

  • লিঙ্গ ও বয়স: নারীদের মধ্যে (বিশেষ করে ৪০ বছরের বেশি) এবং গর্ভাবস্থায় ঝুঁকি বেশি।
  • ওজন: স্থূলতা বা দ্রুত ওজন হ্রাস কোলেস্টেরল পাথরের ঝুঁকি বাড়ায়।
  • ডায়েট: উচ্চ চর্বি, কম ফাইবার বা প্রক্রিয়াজাত খাবারের ডায়েট।
  • জিনগত প্রবণতা: পারিবারিক ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বেশি।
  • অন্যান্য রোগ: ডায়াবেটিস, লিভার সিরোসিস, ক্রোন’স ডিজিজ বা রক্তশূন্যতা।
  • ওষুধ: গর্ভনিরোধক বড়ি বা হরমোন থেরাপি ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

অস্ত্রোপচারের বিকল্প

পিত্তথলির পাথরের চিকিৎসা লক্ষণের তীব্রতার উপর নির্ভর করে। যদি পাথর কোনো সমস্যা না করে, তবে সাধারণত চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। তবে লক্ষণ থাকলে নিম্নলিখিত বিকল্প রয়েছে:

অস্ত্রোপচার

  • কোলেসিস্টেকটমি: পিত্তথলি অপসারণ সবচেয়ে সাধারণ চিকিৎসা। এটি দুই ধরনের:
    • ল্যাপারোস্কোপিক কোলেসিস্টেকটমি: ছোট ছেদ দিয়ে পিত্তথলি অপসারণ, যা দ্রুত সেরে ওঠে এবং কম ব্যথাদায়ক।
    • ওপেন সার্জারি: জটিল ক্ষেত্রে বড় ছেদের মাধ্যমে অপসারণ।
  • অস্ত্রোপচারের পর জীবনযাত্রা: পিত্তথলি ছাড়া স্বাভাবিক জীবন সম্ভব, তবে কিছু রোগীর হজমে সমস্যা হতে পারে, যা ডায়েট দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

অ-অস্ত্রোপচার পদ্ধতি

  • ওষুধ: ইউরসোডিওল বা চেনোডিওলের মতো ওষুধ ছোট কোলেস্টেরল পাথর গলাতে পারে, তবে এটি ধীরগতির এবং সবার জন্য কার্যকর নয়।
  • ইআরসিপি (ERCP): পিত্তনালী থেকে পাথর অপসারণের জন্য এন্ডোস্কোপি ব্যবহার, যা সাধারণত জন্ডিস বা প্যানক্রিয়াটাইটিসের ক্ষেত্রে করা হয়।
  • শক ওয়েভ থেরাপি (ESWL): বিরল ক্ষেত্রে শক ওয়েভ দিয়ে পাথর ভাঙা হয়।

প্রতিরোধের উপায়

পিত্তথলির পাথর প্রতিরোধে জীবনযাত্রার পরিবর্তন কার্যকর:

  • স্বাস্থ্যকর ডায়েট: ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার (ফল, শাকসবজি, গোটা শস্য), কম চর্বি এবং পরিমিত ক্যালোরি গ্রহণ।
  • ওজন নিয়ন্ত্রণ: ধীরে ধীরে ওজন কমানো এবং স্থূলতা এড়ানো।
  • নিয়মিত ব্যায়াম: সপ্তাহে ১৫০ মিনিট মাঝারি ব্যায়াম পিত্তরসের ভারসাম্য রক্ষা করে।
  • হাইড্রেশন: পর্যাপ্ত পানি পান পিত্তরস পাতলা রাখে।
  • নিয়মিত পরীক্ষা: ঝুঁকিপ্রবণ ব্যক্তিদের আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে স্ক্রিনিং।

 

Leave A Comment