সেভিয়ার কম্বাইন্ড ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি (SCID), যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে ‘বাবল বয় ডিজিজ’ নামেও পরিচিত, এটি একটি অত্যন্ত বিরল এবং জীবনঘাতী জেনেটিক ব্যাধি। এই রোগে আক্রান্ত শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম বলতে গেলে প্রায় থাকেই না। সাধারণত জন্মের সময় শিশুকে সুস্থ মনে হলেও, শরীরের সুরক্ষা কবজ না থাকায় পরবর্তী কয়েক মাস তাদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর বয়স ১ বছর হওয়ার আগে বা রোগটি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর মাসখানেক আগেই শরীর ৪টি প্রধান বিপৎসংকেত দেয়। সময়মতো এই লক্ষণগুলো শনাক্ত করতে পারলে উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে শিশুকে নতুন জীবন দান করা সম্ভব।
১ বছর হওয়ার আগেই SCID-এর যে ৪টি লক্ষণ দেখা দেয়
১. নাছোড়বান্দা ওরাল থ্রাশ বা মুখে ছত্রাক সংক্রমণ
শিশুদের মুখে মাঝেমাঝে সাদা আস্তরণ বা ছত্রাক (Candida) দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু SCID আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে এই ছত্রাক সংক্রমণ বা ‘থ্রাশ’ কিছুতেই সারতে চায় না। আপনি যদি দেখেন ওষুধ দেওয়ার পরও শিশুর মুখে, জিভে বা গলায় বারবার সাদা দইয়ের মতো আস্তরণ ফিরে আসছে এবং এটি শিশুর খাবার গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে, তবে এটি ইমিউন সিস্টেমের মারাত্মক ত্রুটির লক্ষণ হতে পারে।
২. ওজন বৃদ্ধি থমকে যাওয়া (Failure to Thrive)
একটি সুস্থ শিশু প্রতি মাসে নির্দিষ্ট হারে ওজন ও উচ্চতায় বৃদ্ধি পায়। কিন্তু SCID-এর ক্ষেত্রে দেখা যায়, পর্যাপ্ত বুকের দুধ বা পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরও শিশুর ওজন বাড়ছে না বা বরং কমছে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকায় ছোটখাটো জীবাণুর সাথে লড়াই করতে গিয়েই শরীরের সব শক্তি শেষ হয়ে যায়, যা শিশুর শারীরিক বৃদ্ধিতে বাধা দেয়।
৩. দীর্ঘস্থায়ী এবং বারবার ডায়রিয়া
SCID আক্রান্ত শিশুদের অন্ত্রে খুব সহজেই জীবাণু সংক্রমণ ঘটে। এর ফলে শিশু দীর্ঘমেয়াদী ডায়রিয়ায় ভোগে। এই ডায়রিয়া সাধারণ পেটের অসুখের মতো নয়; এটি কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে এবং এর ফলে শিশু দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে। অন্ত্রের এই দুর্বলতা নির্দেশ করে যে শরীর ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসকে প্রতিহত করতে পারছে না।
৪. বারবার জটিল নিউমোনিয়া ও ফুসফুসের সংক্রমণ
একজন সাধারণ শিশুর সর্দি-কাশি হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু ১ বছর বয়সের আগে যদি কোনো শিশু দুই বা ততোধিক বার নিউমোনিয়া বা তীব্র ব্রঙ্কাইটিসে আক্রান্ত হয়, তবে চিকিৎসকরা একে ‘রেড ফ্ল্যাগ’ হিসেবে গণ্য করেন। বিশেষ করে যদি এই সংক্রমণগুলো সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক বা চিকিৎসায় কাজ না করে এবং বারবার শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়, তবে তা সেভিয়ার কম্বাইন্ড ইমিউনোডেফিসিয়েন্সির স্পষ্ট সংকেত।
নবজাতকের স্ক্রিনিং
বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে শিশু জন্মের কয়েক দিনের মধ্যেই ‘নিওনেটাল স্ক্রিনিং’ (Newborn Screening)-এর মাধ্যমে SCID শনাক্ত করা সম্ভব। যদি দ্রুত রোগ ধরা পড়ে, তবে বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট (BMT) বা জিন থেরাপির মাধ্যমে শিশু সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে পারে।
পরামর্শ:
যদি আপনার শিশুর মধ্যে ওপরের চারটি লক্ষণ একসাথে বা বারবার দেখা যায়, তবে সাধারণ পেডিয়াট্রিশিয়ানের পাশাপাশি একজন ইমিউনোলজিস্টের পরামর্শ নিন। সাধারণ রক্ত পরীক্ষার (Complete Blood Count) মাধ্যমে শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা দেখেই প্রাথমিক ধারণা পাওয়া সম্ভব।
