x
d o c t o r s 2 4
26 Jan

কল্পবিজ্ঞান এখন বাস্তবতার দুয়ারে। হাত-পা নাড়িয়ে কাজ করার সক্ষমতা হারিয়েছেন যারা, তাদের জন্য আশার আলো হয়ে এসেছে ‘ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস’ (BCI) প্রযুক্তি। মানুষের মস্তিষ্ককে সরাসরি কম্পিউটারের সাথে যুক্ত করার এই বৈপ্লবিক পদ্ধতি পক্ষাঘাত (Paralysis) এবং জটিল নিউরোলজিক্যাল সমস্যার চিকিৎসায় বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

পক্ষাঘাতগ্রস্ত কোনো ব্যক্তি যদি কেবল চিন্তা করেই একটি রোবটিক হাত নাড়াতে পারেন বা কম্পিউটারে টাইপ করতে পারেন, তবে সেটি অলৌকিক ঘটনার চেয়ে কম কিছু নয়। বিসিআই প্রযুক্তি মূলত এই অসম্ভবকেই সম্ভব করছে। এই পদ্ধতিতে মস্তিষ্কের ভেতরে বা বাইরে বিশেষ সেন্সর বসানো হয়, যা মস্তিষ্কের নিউরনের বৈদ্যুতিক সংকেতগুলোকে সংগ্রহ করে। এরপর সেই সংকেতগুলোকে অ্যালগরিদমের মাধ্যমে রূপান্তর করা হয় ডিজিটাল কমান্ডে, যা দিয়ে হুইলচেয়ার, কৃত্রিম অঙ্গ বা কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল পক্ষাঘাতগ্রস্তদের জন্য নয়, বরং ‘লকড-ইন সিন্ড্রোম’ বা এএলএস (ALS)-এর মতো স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য পৃথিবীর সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। অতীতে যেখানে মেরুদণ্ডের আঘাত মানেই ছিল আজীবন বিছানায় পড়ে থাকা, সেখানে বিসিআই প্রযুক্তি স্নায়বিক সংযোগের একটি কৃত্রিম সেতু তৈরি করে দিচ্ছে।

বিসিআই প্রযুক্তির উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা ও প্রয়োগ:

এই প্রযুক্তির উৎকর্ষতা কেবল বিজ্ঞানীদের গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ নেই, এর ব্যবহারিক প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। এর মূল দিকগুলো হলো:

  • স্নায়বিক সেতুর পুনঃনির্মাণ: মস্তিষ্কের সংকেতকে পেশিতে পৌঁছে দেওয়ার বিকল্প পথ তৈরি করে পক্ষাঘাতগ্রস্তদের চলাচলে সহায়তা করা।

  • চিন্তার শক্তিতে যোগাযোগ: কথা বলার ক্ষমতা হারানো রোগীরা কেবল চিন্তা করেই স্ক্রিনে লেখা ফুটিয়ে তুলতে পারবেন।

  • প্রোস্থেটিক্সের নিয়ন্ত্রণ: কৃত্রিম হাত বা পা এখন আর জড় বস্তু নয়, বরং মস্তিষ্কের নির্দেশে রক্তমাংসের অঙ্গের মতোই কাজ করবে।

  • স্মৃতি ও মস্তিষ্কের ব্যাধির চিকিৎসা: আলঝেইমার বা পারকিনসনস রোগীদের মস্তিষ্কের বিশেষ অংশে উদ্দীপনা দিয়ে রোগের লক্ষণ উপশম করা।

তবে এই প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা। মস্তিষ্কের ভেতরে ইলেকট্রোড বসানোর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি এবং মানুষের ব্যক্তিগত চিন্তার সুরক্ষা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নীতিগত বিতর্ক চলছে। তবুও ইলন মাস্কের ‘নিুরালিঙ্ক’ বা ‘সিনক্রন’-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সাম্প্রতিক সাফল্য প্রমাণ করেছে যে, আগামী এক দশকের মধ্যে বিসিআই প্রযুক্তি সাধারণ রোগীদের হাতের নাগালে চলে আসতে পারে।

বাংলাদেশে নিউরো-মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের পক্ষাঘাতগ্রস্ত বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে আশীর্বাদ হয়ে আসবে। যদিও এই মুহূর্তে বিসিআই বেশ ব্যয়বহুল এবং এর অবকাঠামো গড়া কঠিন, তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ন্যানোটেকনোলজির সমন্বয়ে এর খরচ ও জটিলতা দুটোই কমানো সম্ভব।

মানুষের মন এবং যন্ত্রের এই সেতুবন্ধন কেবল শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয়ের লড়াই নয়, এটি মানব বিবর্তনের এক নতুন অধ্যায়। ‘ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস’ প্রযুক্তির জয়যাত্রা পক্ষাঘাতগ্রস্তদের শুধু সক্ষমতাই ফিরিয়ে দেবে না, বরং তাদের দেবে মর্যাদা ও স্বাধীনতার স্বাদ। হয়তো খুব শিগগিরই এমন এক দিন আসবে যখন হুইলচেয়ারে বসে থাকা একজন ব্যক্তি কেবল ইচ্ছাশক্তির জোরেই দুনিয়া জয় করবেন।

Leave A Comment