বিশ্বব্যাপী মূত্রাশয় ক্যান্সারের ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে। অনেকেই এর লক্ষণ সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করতে পারেন না, যা রোগকে আরও জটিল করে তোলে। প্রাথমিক পর্যায়ে মূত্রাশয় ক্যান্সার শনাক্ত করা হলে চিকিৎসা অনেক বেশি কার্যকর হয়। তাই আসুন জেনে নিই মূত্রাশয় ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ ও প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে।
মূত্রাশয় ক্যান্সার কী?
মূত্রাশয় ক্যান্সার ঘটে যখন মূত্রাশয়ের কোষগুলি অস্বাভাবিকভাবে এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে বাড়তে শুরু করে। মূত্রাশয় হল পেটের নিচের অংশে অবস্থিত একটি ত্রিভুজাকার পেশীবহুল অঙ্গ, যেখানে প্রস্রাব জমা হয়। এটি প্রস্রাব সংগ্রহের সময় প্রসারিত হয় এবং প্রস্রাব ত্যাগের সময় সংকুচিত হয়ে মূত্রনালীর মাধ্যমে প্রস্রাব বের করে দেয়। প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণগুলো শনাক্ত করা হলে মূত্রাশয় ক্যান্সারের চিকিৎসা সহজ ও কার্যকর হয়।
মূত্রাশয় ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ
- প্রস্রাবে রক্ত বা জমাট বাঁধা: প্রস্রাবে রক্ত (হেমাটুরিয়া) মূত্রাশয় ক্যান্সারের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ। এটি প্রস্রাবের রঙ গোলাপী, লাল বা বাদামী করে তুলতে পারে। এই লক্ষণ দেখলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- প্রস্রাবের সময় ব্যথা বা জ্বালাপোড়া: প্রস্রাব করার সময় জ্বালা বা ব্যথা অনুভব করা মূত্রাশয় ক্যান্সারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা।
- ঘন ঘন প্রস্রাব: বিশেষ করে রাতে বারবার প্রস্রাবের প্রয়োজন অনুভব করা (নকটুরিয়া) একটি লক্ষণ হতে পারে।
- প্রস্রাবের দ্বিধা: প্রস্রাব করার তাগিদ অনুভব করা কিন্তু প্রস্রাব করতে না পারা, বা মূত্রাশয় পুরোপুরি খালি না হওয়া, যার ফলে প্রস্রাবের ফ্রিকোয়েন্সি বেড়ে যায়।
- পিঠে বা পেটে ব্যথা: মূত্রাশয়ের চারপাশে বা পিঠের নিচের অংশে অবিরাম ব্যথা ক্যান্সারের উন্নত পর্যায়ে দেখা দিতে পারে।
- ক্লান্তি ও ওজন হ্রাস: অব্যক্ত ক্লান্তি, ক্ষুধা হ্রাস বা ওজন কমে যাওয়াও ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।
মূত্রাশয় ক্যান্সারের কারণ
- ধূমপান: ধূমপান মূত্রাশয় ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়, কারণ তামাকের ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রস্রাবের মাধ্যমে মূত্রাশয়ে পৌঁছায়।
- রাসায়নিক সংস্পর্শ: রং, রাসায়নিক বা পেট্রোলিয়াম পণ্যের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের ঝুঁকি বেশি।
- দীর্ঘস্থায়ী মূত্রাশয় সংক্রমণ: বারবার মূত্রনালীর সংক্রমণ বা প্রদাহ ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
- জেনেটিক কারণ: পরিবারে মূত্রাশয় ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বাড়ে।
- বয়স ও লিঙ্গ: ৫৫ বছরের বেশি বয়সী পুরুষদের মধ্যে এই ক্যান্সার বেশি দেখা যায়।
প্রতিরোধের উপায়
- ধূমপান ত্যাগ: ধূমপান বন্ধ করুন, কারণ এটি মূত্রাশয় ক্যান্সারের প্রধান কারণগুলোর একটি।
- পর্যাপ্ত পানি পান: প্রচুর পানি পান করলে মূত্রাশয়ে ক্ষতিকর পদার্থ জমতে পারে না এবং ঝুঁকি কমে।
- স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: ফল, শাকসবজি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার খান। সাইট্রাস ফল, বেরি এবং সবুজ শাকসবজি মূত্রাশয়ের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
- রাসায়নিক এড়ানো: কর্মক্ষেত্রে ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ কমানোর জন্য সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিন।
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা: প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে বা ঝুঁকির কারণ থাকলে নিয়মিত ইউরোলজিস্টের কাছে পরীক্ষা করান।
- মূত্রনালীর সংক্রমণের চিকিৎসা: বারবার মূত্রনালীর সংক্রমণ হলে তা দ্রুত চিকিৎসা করান।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
যদি আপনি প্রস্রাবে রক্ত, ব্যথা, ঘন ঘন প্রস্রাব বা প্রস্রাবের দ্বিধার মতো লক্ষণ অনুভব করেন, তবে দ্রুত একজন ইউরোলজিস্ট বা চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করুন। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রস্রাব পরীক্ষা, সিস্টোস্কোপি বা ইমেজিং টেস্ট করা হতে পারে। চিকিৎসার মধ্যে অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি বা ইমিউনোথেরাপি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে, যা ক্যান্সারের পর্যায়ের উপর নির্ভর করে।
