প্রতি মাসে মাসিক চক্রের সঙ্গে অনেক নারীই নানা অস্বস্তি অনুভব করেন। এটি প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিন্ড্রোম বা পিএমএস নামে পরিচিত, যা মাসিক শুরুর ১-২ সপ্তাহ আগে থেকে শুরু হয়ে মাসিক আসার সঙ্গে সঙ্গে কমে যায়। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুসারে, প্রায় ৮৫% নারী পিএমএসের কোনো না কোনো লক্ষণ অনুভব করেন।
সাম্প্রতিক ২০২৫ সালের গবেষণায় (জার্নাল অফ অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডারস) দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪৭.৮% নারী পিএমএসে আক্রান্ত, এবং গুরুতর ক্ষেত্রে (পিএমডিডি) এটি ১.৬%-৫.৮% পর্যন্ত হতে পারে।
২০২৫-এর একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্ট্রেস এবং নিউরোইনফ্লেমেশন পিএমএসের লক্ষণকে আরও তীব্র করে তোলে। মাসিকের ঠিক ১ সপ্তাহ আগে এই লক্ষণগুলো সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়, যা উপেক্ষা করলে দৈনন্দিন জীবন প্রভাবিত হয়। এই লক্ষণগুলো চিনে রাখলে সময়মতো ব্যবস্থা নিয়ে অস্বস্তি কমানো সম্ভব।
মেনস্ট্রুয়াল ডিসঅর্ডার বা পিএমএস কী এবং কেন হয়?
পিএমএস হলো মাসিক চক্রের লুটিয়াল ফেজে (ওভুলেশনের পর) হরমোনের ওঠানামা থেকে উদ্ভূত শারীরিক ও মানসিক লক্ষণসমূহ। ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়ায় সেরোটোনিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটার প্রভাবিত হয়। মেয়ো ক্লিনিকের মতে, এটি সাধারণত মাসিকের ৫-১১ দিন আগে শুরু হয় এবং মাসিক শুরু হলে চলে যায়। ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে স্ট্রেস, ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং পরিবারের ইতিহাস।
নতুন গবেষণা (২০২৫, ফ্রন্টিয়ার্স জার্নাল): নিউরোইনফ্লেমেশন এবং স্ট্রেস পিএমএসের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা মস্তিষ্কে ইনফ্লেমেটরি মার্কার বাড়ায় এবং লক্ষণ তীব্র করে।
১ সপ্তাহ আগে দেখা দেয় যে ৫টি প্রধান লক্ষণ
পিএমএসের লক্ষণ মাসিকের ১ সপ্তাহ আগে সবচেয়ে তীব্র হয়ে ওঠে। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন এবং সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে নির্বাচিত ৫টি সাধারণ লক্ষণ নিম্নরূপ:
- পেট ফোলা এবং ওজন বৃদ্ধি: হরমোনের কারণে পানি জমে শরীর ফুলে যায়, বিশেষ করে পেটে। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক বলছে, এটি মাসিকের ১ সপ্তাহ আগে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এবং অস্বস্তি সৃষ্টি করে।
- স্তনের সংবেদনশীলতা ও ব্যথা: স্তন ফুলে যাওয়া এবং স্পর্শে ব্যথা। এটি ইস্ট্রোজেনের ওঠানামার ফলে হয় এবং ৮৫% নারীর মধ্যে দেখা যায়।
- মেজাজের পরিবর্তন ও খিটখিটে ভাব: হঠাৎ রাগ, উদ্বেগ বা বিষণ্ণতা। ২০২৫-এর গবেষণায় দেখা গেছে, সেরোটোনিনের অস্থিরতা এর জন্য দায়ী, যা মাসিকের ১ সপ্তাহ আগে তীব্র হয়।
- ক্লান্তি এবং মাথাব্যথা: অস্বাভাবিক ক্লান্তি এবং মাইগ্রেনের মতো ব্যথা। নতুন তথ্য: প্রোজেস্টেরন কমার ফলে এটি বাড়ে এবং ঘুমের সমস্যা যোগ করে।
- খাবারের লোভ এবং ব্রণ: মিষ্টি বা লবণাক্ত খাবারের প্রতি অদম্য ইচ্ছে এবং মুখে ব্রণ। গবেষণায় দেখা গেছে, হরমোনাল পরিবর্তন ত্বকের তেল উৎপাদন বাড়ায়।
প্রতিরোধ ও চিকিৎসা:
সাম্প্রতিক গবেষণায় (২০২৫) দেখা গেছে, নিয়মিত ব্যায়াম এবং যোগা পিএমএসের লক্ষণ ৩০-৪০% কমাতে পারে। ক্যাফেইন, লবণ এবং চিনি কম খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ। ওষুধে এসএসআরআই (অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট) মানসিক লক্ষণ কমায়, এবং হরমোনাল বার্থ কন্ট্রোল শারীরিক লক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করে।
ভিটামিন বি৬, ক্যালসিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম সাপ্লিমেন্ট লক্ষণ কমাতে সাহায্য করে। গুরুতর ক্ষেত্রে (পিএমডিডি) চিকিৎসকের পরামর্শ অবশ্যই নিন।
পিএমএস স্বাভাবিক হলেও অতিরিক্ত হলে জীবনমান প্রভাবিত হয়। সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন দিয়ে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখুন। কোনো লক্ষণ তীব্র হলে চিকিৎসক দেখান।
