শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলার কারণে সৃষ্ট রক্তনালীর প্রদাহ বা ‘হেনোচ-স্কোনলাইন পারপুরা’ (HSP) বর্তমানে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিডনি ও অন্ত্রের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলা এই ব্যাধিটি পূর্ণ রূপ নেওয়ার অন্তত ১৪ দিন বা দুই সপ্তাহ আগে থেকেই শরীরে চারটি সুনির্দিষ্ট সংকেত দিয়ে থাকে।
হেনোচ-স্কোনলাইন পারপুরা মূলত একটি ‘আইজিএ ভাসকুলাইটিস’। এটি শরীরের ক্ষুদ্র রক্তনালীগুলোতে প্রদাহ সৃষ্টি করে, যার ফলে ত্বক, জয়েন্ট, অন্ত্র এবং বিশেষ করে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি অটো-ইমিউন রেসপন্স, যা সাধারণত কোনো শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের পর শুরু হয়। বাংলাদেশে অনেক অভিভাবক ত্বকের লাল ছোপকে সাধারণ অ্যালার্জি ভেবে ভুল করেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগের চূড়ান্ত পর্যায়ে পায়ে বেগুনি রঙের ছোপ পড়ার অন্তত দুই সপ্তাহ আগে শরীর কিছু ‘প্রাক-লক্ষণ’ প্রকাশ করে।
২ সপ্তাহ আগে থেকে শরীরে প্রকট হওয়া ৪টি প্রধান লক্ষণ
রিউমাটোলজিস্ট ও শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, এইচএসপি-র আক্রমণ হঠাৎ মনে হলেও এর নেপথ্যে ১৪ দিন আগে থেকেই নিচের পরিবর্তনগুলো পর্যায়ক্রমে দেখা দেয়:
-
উর্ধ্ব-শ্বাসনালীর মৃদু সংক্রমণ বা সর্দি-কাশি: এটি এই রোগের সবচেয়ে সাধারণ পূর্বাভাস। দুই সপ্তাহ আগে শিশুর সামান্য সর্দি, গলা ব্যথা কিংবা মৃদু জ্বর দেখা দিতে পারে। আমরা একে সাধারণ সিজনাল ফ্লু মনে করলেও, এই সংক্রমণই শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে উত্তেজিত করে রক্তনালীতে আঘাত হানার পথ প্রশস্ত করে।
-
পেটে মাঝেমধ্যে মোচড় দেওয়া ব্যথা: কোনো হজমের সমস্যা ছাড়াই যদি শিশু দুই সপ্তাহ আগে থেকে পেটে অস্বস্তি বা মাঝেমধ্যে মৃদু ব্যথার কথা জানায়, তবে তা সতর্কবার্তার অংশ হতে পারে। এটি ক্ষুদ্রান্ত্রের রক্তনালীতে প্রাথমিক প্রদাহের ইঙ্গিত দেয়।
-
জয়েন্টে হালকা জড়তা ও অস্বস্তি: বিশেষ করে গোড়ালি এবং হাঁটুতে কোনো চোট ছাড়াই সামান্য ব্যথা বা নাড়াচাড়া করতে কষ্ট হওয়া। অনেক সময় এই অস্বস্তি আসে এবং চলে যায়, যা অভিভাবকরা অনেক সময় গুরুত্ব দেন না। কিন্তু দুই সপ্তাহ আগে থেকেই জয়েন্টের চারপাশের টিস্যুতে তরল জমা হতে শুরু করে।
-
অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও ক্ষুধামন্দা: শিশু যদি হুট করে খেলাধুলায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং খাবারে অনীহা দেখায়, তবে তা শরীরের অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ের সংকেত হতে পারে। রক্তনালীর দেয়ালে প্রদাহ শুরু হওয়ার ফলে শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে, যা রোগের পূর্ণ বিকাশের ১৪ দিন আগে থেকেই মৃদুভাবে শুরু হয়।
হেনোচ-স্কোনলাইন পারপুরা সম্পর্কে কিছু জরুরি তথ্য
রোগটির প্রকৃতি ও ভয়াবহতা বুঝতে নিচের তথ্যগুলো অত্যন্ত কার্যকর:
-
প্রধান ভুক্তভোগী: এটি প্রধানত ২ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, তবে বড়দের ক্ষেত্রেও এটি বিরল নয়।
-
কিডনি ঝুঁকি: আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশের ক্ষেত্রে কিডনির জটিলতা দেখা দিতে পারে, যা প্রস্রাবের সাথে রক্ত বা প্রোটিন যাওয়ার মাধ্যমে ধরা পড়ে।
-
শনাক্তকরণ: নির্দিষ্ট কোনো রক্ত পরীক্ষায় এটি নিশ্চিত হওয়া যায় না। প্রধানত শারীরিক লক্ষণ (বিশেষ করে পায়ের লাল ছোপ বা পারপুরা) দেখে চিকিৎসকরা এটি শনাক্ত করেন।
প্রতিকার ও সচেতনতা
এইচএসপি-র সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক নেই, তবে লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিলে অধিকাংশ শিশু দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে বিপত্তি ঘটে যখন দুই সপ্তাহ আগে থেকে পাওয়া এই সংকেতগুলোকে অবহেলা করা হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো—সর্দি-কাশির পর যদি শিশুর পেটে ব্যথা বা জয়েন্টে সমস্যা দেখা দেয়, তবে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সময়মতো রোগ নির্ণয় হলে স্টেরয়েড বা অন্যান্য ওষুধের মাধ্যমে কিডনির স্থায়ী ক্ষতি রোধ করা সম্ভব।
শরীরের প্রতিটি ছোট পরিবর্তনই কোনো না কোনো বার্তা বহন করে। হেনোচ-স্কোনলাইন পারপুরা কোনো মরণব্যাধি নয়, তবে সঠিক সময়ে সচেতন না হলে এটি দীর্ঘমেয়াদী কিডনি রোগের কারণ হতে পারে। দুই সপ্তাহ আগে থেকে শরীর যে লক্ষণগুলো দেয়, তাকে গুরুত্ব দিলে একটি শিশুকে অনেক যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
