নারীস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এমন কিছু জন্মগত সমস্যা রয়েছে, যেগুলো দীর্ঘদিন অজানা থেকে যায়। তেমনই একটি বিরল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অবস্থা হলো রোকিটানস্কি সিন্ড্রোম বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় MRKH (Mayer-Rokitansky-Küster-Hauser) Syndrome। এই রোগে জন্মগতভাবে জরায়ু ও যোনিপথ আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত থাকে, যদিও বাহ্যিকভাবে মেয়েটি স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে ওঠে। ফলে অনেক সময় দেরিতে ধরা পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়ঃসন্ধির অন্তত এক বছর আগেই শরীরে কিছু সূক্ষ্ম লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যেগুলো সচেতন হলে আগাম শনাক্তকরণ সম্ভব।
নিচে তুলে ধরা হলো ৬টি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বলক্ষণ—
১. মাসিক শুরু না হওয়া (Primary Amenorrhea)
১৪–১৬ বছর পার হওয়ার পরও যদি মাসিক শুরু না হয়, সেটি সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। শরীরের অন্যান্য বৃদ্ধি স্বাভাবিক হলেও পিরিয়ড না হওয়া রোকিতানস্কির প্রধান লক্ষণ হতে পারে।
২. তলপেটে অস্বাভাবিক টান বা ব্যথা
কিছু কিশোরী মাসিক না হলেও মাঝেমধ্যে তলপেটে চাপ বা ব্যথা অনুভব করে। হরমোনের পরিবর্তনের কারণে এমন ব্যথা হলেও জরায়ু না থাকায় রক্তপাত হয় না—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
৩. বয়ঃসন্ধির বিকাশে অসামঞ্জস্য
স্তন ও শরীরের অন্যান্য অঙ্গ স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হলেও অভ্যন্তরীণ প্রজনন অঙ্গের বিকাশ অসম্পূর্ণ থাকতে পারে। বাহ্যিক স্বাভাবিকতা অনেক সময় সমস্যাকে আড়াল করে দেয়।
৪. মূত্রনালীর সমস্যা বা ঘন ঘন সংক্রমণ
গবেষণায় দেখা গেছে, MRKH রোগীদের প্রায় ৩০–৪০% ক্ষেত্রে কিডনি বা মূত্রনালীর গঠনগত ত্রুটি থাকে। ছোটবেলা থেকেই প্রস্রাবের সংক্রমণ, ব্যথা বা অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে সতর্ক হওয়া উচিত।
৫. কোমর বা মেরুদণ্ডে ব্যথা
এই সিন্ড্রোমের সঙ্গে কখনো কখনো হাড় বা মেরুদণ্ডের গঠনগত সমস্যা যুক্ত থাকে। অল্প বয়সেই অকারণে কোমর ব্যথা বা শরীর বাঁকা হয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিলে পরীক্ষা করা জরুরি।
৬. মানসিক অস্থিরতা ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি
হরমোনগত পরিবর্তন ও শারীরিক অস্বাভাবিকতার কারণে কিশোরীদের মধ্যে হতাশা, উদ্বেগ বা সামাজিক অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। পরিবার যদি এসব লক্ষণ গুরুত্ব না দেয়, সমস্যা বাড়তে পারে।
কেন আগাম শনাক্তকরণ জরুরি?
গাইনোকোলজিস্টদের মতে, আল্ট্রাসাউন্ড, এমআরআই ও হরমোন টেস্টের মাধ্যমে দ্রুত রোগ নির্ণয় সম্ভব। আগে থেকে জানা গেলে—
- প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরিকল্পনা নেওয়া যায়
- মানসিক কাউন্সেলিং দেওয়া সম্ভব
- ভবিষ্যতে সার্জারি বা বিকল্প মাতৃত্ব (IVF, সারোগেসি) নিয়ে সিদ্ধান্ত সহজ হয়
চিকিৎসা কী?
এই রোগ পুরোপুরি সারানো না গেলেও আধুনিক চিকিৎসায় স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব। যোনিপথ পুনর্গঠন সার্জারি, হরমোন থেরাপি এবং মনো-সমর্থনমূলক চিকিৎসা কার্যকর ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
চিকিৎসকেরা বলছেন, “১৬ বছরেও মাসিক না হলে এটিকে লজ্জার বিষয় মনে না করে অবিলম্বে গাইনোকোলজিস্টের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।” পরিবার ও স্কুল পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
রোকিটানস্কি সিন্ড্রোম বিরল হলেও অবহেলা করলে মানসিক ও শারীরিক জটিলতা বাড়তে পারে। তাই কিশোরীদের স্বাস্থ্য পরিবর্তনগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখাই হতে পারে সুস্থ ভবিষ্যতের প্রথম পদক্ষেপ।
