x
d o c t o r s 2 4
18 Nov

দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার যেমন দই, পনির, চিজ বা আইসক্রিম—আমাদের খাদ্যতালিকায় দীর্ঘদিনের প্রিয় উপাদান। কিন্তু অনেকের শরীর ধীরে ধীরে এই খাবারগুলো সহ্য করতে পারে না। একে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলা হয় ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে শরীরে ল্যাকটেজ (Lactase) নামক এনজাইমের ঘাটতি দেখা দেয়, ফলে দুধে থাকা ল্যাকটোজ (Lactose) বা দুধের শর্করা হজম করতে সমস্যা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমস্যা হঠাৎ হয় না—বরং কয়েক মাস আগেই শরীরে এর সূক্ষ্ম ইঙ্গিত দেখা দেয়। বিশেষ করে ৩ মাস আগেই দেহ এমন কিছু সংকেত দেয়, যা অনেকেই সাধারণ পেটের অসুস্থতা ভেবে এড়িয়ে যান। অথচ, সময়মতো এগুলো চিহ্নিত করা গেলে সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

নিচে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের ৩ মাস আগে শরীরে দেখা দিতে পারে এমন ৬টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ তুলে ধরা হলো—

১. দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার পর পেট ফাঁপা

সবচেয়ে সাধারণ এবং প্রাথমিক লক্ষণ হলো দুধ, দই বা চিজ খাওয়ার পর পেটে গ্যাস বা অস্বস্তি অনুভব করা। এটি ঘটে কারণ ল্যাকটোজ হজম না হওয়ায় অন্ত্রে ফারমেন্টেশন প্রক্রিয়া বাড়ে, ফলে গ্যাস জমে পেট ফাঁপা বা ফুলে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি হয়।

২. পেট ব্যথা ও মৃদু ক্র্যাম্প

খাবারের দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর পেটে মোচড়ানো ব্যথা বা অল্প ক্র্যাম্প হওয়া—এটিও ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের আগাম ইঙ্গিত। অনেক সময় এই ব্যথা মাঝেমধ্যে আসে, যা প্রথমদিকে অনেকেই হজমের সমস্যা বলে ধরে নেন।

৩. ঘন ঘন ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা

হজম না হওয়া ল্যাকটোজ শরীরে জমে থেকে অন্ত্রের জলের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়, যার ফলে ঘন ঘন পাতলা পায়খানা হতে পারে। এটি সাধারণত দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার পরেই ঘটে। তিন মাস আগেই এই পরিবর্তন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু করে।

৪. অম্বল, ঢেঁকুর ও পেটের গর্জন

অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়—দুধ খাওয়ার কিছুক্ষণ পর অম্বল, ঢেঁকুর বা পেটের ভেতর গর্জন শুরু হয়। এটি অন্ত্রের ভেতরে গ্যাস জমে যাওয়ার ফল। এসব শব্দ ও অস্বস্তি প্রায়ই অফিস বা সামাজিক পরিবেশে অপ্রস্তুত করে তোলে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক চাপও সৃষ্টি করতে পারে।

৫. ত্বকে ফুসকুড়ি ও ব্রণ

যদিও অনেকেই জানেন না, ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স কেবল হজমের সমস্যা নয়; এটি ত্বকেও প্রভাব ফেলতে পারে। শরীরে হজম না হওয়া ল্যাকটোজ প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা ব্রণ, ফুসকুড়ি বা ত্বকের লালচে দাগ হিসেবে প্রকাশ পায়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ২০% ক্ষেত্রে এই উপসর্গটি ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের আগাম ইঙ্গিত হতে পারে।

৬. ক্লান্তি ও মনোযোগে ঘাটতি

ল্যাকটোজ হজমে ব্যর্থ শরীর ক্রমাগত প্রদাহ ও পুষ্টির ঘাটতিতে ভুগতে শুরু করে। ফলে দেখা দেয় অতিরিক্ত ক্লান্তি, মনোযোগে সমস্যা ও ঘুমের অস্বাভাবিকতা। এটি সাধারণত ধীরে ধীরে বাড়ে এবং তিন মাসের মধ্যেই দৈনন্দিন কাজে প্রভাব ফেলে।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

গবেষণায় দেখা গেছে, এশীয় ও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের মধ্যে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। এছাড়া যারা অন্ত্রের সংক্রমণ, সিলিয়াক ডিজিজ বা দীর্ঘদিন অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করেছেন, তাদের ঝুঁকিও বেশি।

প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

চিকিৎসকের পরামর্শে ‘ল্যাকটেজ সাপ্লিমেন্ট’ গ্রহণ, এবং ল্যাকটোজমুক্ত দুধ (Lactose-free milk) ব্যবহার উপকারী হতে পারে। এছাড়া, দুধের পরিবর্তে বাদাম দুধ, সোয়া দুধ বা ওট মিল্কের মতো বিকল্পও কার্যকর।
এছাড়া দই বা ফারমেন্টেড দুগ্ধজাত খাবারে প্রোবায়োটিক থাকায় অনেকের ক্ষেত্রে হজমে সহায়তা করে।

ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সকে সাধারণ গ্যাস্ট্রিক ভেবে এড়িয়ে গেলে পরবর্তীতে তা পুষ্টির ঘাটতি ও অন্ত্রের জটিলতায় রূপ নিতে পারে। তাই যদি তিন মাস আগেই এসব লক্ষণ দেখা যায়, তবে দুধের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। শরীরের দেওয়া সংকেতগুলোই হতে পারে সুস্থ থাকার প্রথম পদক্ষেপ।

Leave A Comment