x
d o c t o r s 2 4
08 Sep

স্কোলিওসিস হলো মেরুদণ্ডের অস্বাভাবিক বক্রতা, যা সাধারণত “S” বা “C” আকৃতির হয়। এটি একটি সাধারণ অবস্থা, যা শিশু, কিশোর এবং প্রাপ্তবয়স্কদের প্রভাবিত করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় ২-৩% মানুষ স্কোলিওসিসে আক্রান্ত। এটি শরীরের ভঙ্গিমা, চলাফেরা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে ফুসফুস বা হৃদপিণ্ডের কার্যকারিতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এই নিবন্ধে আমরা স্কোলিওসিসের কারণ, লক্ষণ এবং চিকিৎসার উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

স্কোলিওসিস কী?

স্কোলিওসিস হলো মেরুদণ্ডের পাশের দিকে অস্বাভাবিক বাঁক, যা সাধারণত কিশোর বয়সে (১০-১৮ বছর) সনাক্ত হয়। এটি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে: ইডিওপ্যাথিক (কারণ অজানা, প্রায় ৮০% ক্ষেত্রে), কনজেনিটাল (জন্মগত ত্রুটি) এবং নিউরোমাসকুলার (স্নায়বিক বা পেশিজনিত রোগের কারণে)। ইডিওপ্যাথিক স্কোলিওসিস সবচেয়ে সাধারণ এবং প্রায়শই কিশোরী মেয়েদের মধ্যে দেখা যায়। মেরুদণ্ডের বক্রতা ডিগ্রিতে পরিমাপ করা হয় (যেমন, ১০°-২০° হালকা, ৪০°-এর বেশি গুরুতর)।

স্কোলিওসিসের লক্ষণ

স্কোলিওসিসের লক্ষণ প্রায়শই ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় এবং হালকা ক্ষেত্রে লক্ষণীয় নাও হতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলো:

  • অসম ভঙ্গিমা: এক কাঁধ বা নিতম্ব অন্যটির চেয়ে উঁচু বা কোমরের অসমতা।
  • মেরুদণ্ডের বক্রতা: পিঠে “S” বা “C” আকৃতির বাঁক দৃশ্যমান।
  • পিঠে ব্যথা: বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়ানো বা বসার পর।
  • শ্বাসকষ্ট: গুরুতর বক্রতায় ফুসফুসের উপর চাপ পড়ে।
  • ক্লান্তি বা অস্বস্তি: পেশির উপর অতিরিক্ত চাপের কারণে।
  • পোশাকের অসামঞ্জস্য: জামাকাপড় অসমভাবে ফিট করা।

শিশুদের ক্ষেত্রে, পিতামাতারা প্রায়শই স্কুল স্ক্রিনিং বা নিয়মিত চেকআপের সময় এটি সনাক্ত করেন।

স্কোলিওসিসের কারণ

ইডিওপ্যাথিক স্কোলিওসিসের কারণ অজানা হলেও, অন্যান্য ধরনের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • জিনগত প্রবণতা: পারিবারিক ইতিহাসে স্কোলিওসিস থাকলে ঝুঁকি বেশি।
  • জন্মগত ত্রুটি: মেরুদণ্ডের অস্বাভাবিক গঠন।
  • নিউরোমাসকুলার রোগ: সেরিব্রাল পলসি বা মাসকুলার ডিস্ট্রফির মতো রোগ।
  • আঘাত বা সংক্রমণ: মেরুদণ্ডের ক্ষতি বা টিউমার।
  • অন্যান্য: লেগের দৈর্ঘ্যের অসমতা বা অস্টিওপোরোসিস।

চিকিৎসার উপায়

স্কোলিওসিসের চিকিৎসা বক্রতার ডিগ্রি, রোগীর বয়স এবং লক্ষণের তীব্রতার উপর নির্ভর করে। প্রধান চিকিৎসা পদ্ধতি:

পর্যবেক্ষণ

  • হালকা বক্রতা (১০°-২০°): নিয়মিত এক্স-রে এবং ডাক্তারের ফলোআপ। শিশুদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির সময় পর্যবেক্ষণ জরুরি, কারণ বক্রতা বাড়তে পারে।

অ-অস্ত্রোপচার চিকিৎসা

  • ব্রেসিং: ২০°-৪০° বক্রতার ক্ষেত্রে কিশোরদের জন্য ব্রেস (যেমন বোস্টন ব্রেস) ব্যবহার করা হয়। এটি বক্রতা বাড়তে বাধা দেয়, তবে নিরাময় করে না।
  • ফিজিওথেরাপি: স্ক্রোথ পদ্ধতি বা নির্দিষ্ট ব্যায়াম পেশির ভারসাম্য উন্নত করে এবং ব্যথা কমায়।
  • ব্যথা ব্যবস্থাপনা: প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ইবুপ্রোফেন বা ফিজিক্যাল থেরাপি।

অস্ত্রোপচার

  • স্পাইনাল ফিউশন: ৪০°-এর বেশি বক্রতায় মেরুদণ্ডের হাড় একত্রিত করা হয়, যাতে রড বা স্ক্রু ব্যবহার করা হয়। এটি বক্রতা সংশোধন করে এবং স্থিতিশীলতা দেয়।
  • ভার্টিব্রাল বডি টিথারিং: কম আক্রমণাত্মক পদ্ধতি, যা কিশোরদের জন্য ব্যবহৃত হয় এবং মেরুদণ্ডের নমনীয়তা বজায় রাখে।
  • অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি: সংক্রমণ, রক্তক্ষরণ বা স্নায়ুর ক্ষতি, তবে আধুনিক প্রযুক্তিতে এটি নিরাপদ।

জীবনযাত্রার পরিবর্তন

  • নিয়মিত ব্যায়াম: যোগা, পাইলেটস বা সাঁতার পেশি শক্তিশালী করে এবং ভঙ্গিমা উন্নত করে।
  • স্বাস্থ্যকর ডায়েট: ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার হাড়ের স্বাস্থ্য বজায় রাখে।
  • ভঙ্গিমা সংশোধন: বসা বা দাঁড়ানোর সময় সঠিক ভঙ্গিমা মেনে চলা।
  • মানসিক স্বাস্থ্য: স্কোলিওসিস মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তাই কাউন্সেলিং বা সাপোর্ট গ্রুপ সাহায্য করতে পারে।

স্কোলিওসিস পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে প্রাথমিক সনাক্তকরণ গুরুত্বপূর্ণ। স্কুলে স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং পিতামাতার সচেতনতা বক্রতা বাড়ার আগে সনাক্ত করতে সাহায্য করে।

 

Leave A Comment