থাইরয়েড গ্রন্থির ঠিক পেছনেই লুকিয়ে থাকে মটরদানার মতো চারটি ছোট গ্রন্থি, যাদের নাম প্যারাথাইরয়েড। আকারে ক্ষুদ্র হলেও শরীরের ক্যালসিয়ামের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে এদের ক্ষমতা অপরিসীম। যখন এই গ্রন্থিগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে হরমোন নিঃসরণ শুরু করে, তখন শরীরে ক্যালসিয়ামের সুনামি বয়ে যায়—চিকিৎসাবিজ্ঞানে একেই বলা হয় হাইপারপ্যারাথাইরয়েডিজম।
আমাদের রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা ঠিক কত থাকবে, তা সেকেন্ডে সেকেন্ডে মেপে চলে প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থি। কিন্তু এই গ্রন্থি যখন অতি-সক্রিয় হয়ে পড়ে, তখন সে হাড় থেকে ক্যালসিয়াম টেনে রক্তে মিশিয়ে দেয়। ফলে হাড় হয়ে পড়ে ভঙ্গুর আর রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বেড়ে গিয়ে কিডনি ও হৃদপিণ্ডকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। বর্তমানে ভিটামিন D-এর অভাব এবং দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের কারণে এই সমস্যাটি আগের চেয়ে অনেক বেশি শনাক্ত হচ্ছে।
হাইপারপ্যারাথাইরয়েডিজমের প্রধান লক্ষণসমূহ
এই রোগের লক্ষণগুলো সরাসরি বোঝা কঠিন, তাই একে অনেক সময় ‘অদৃশ্য রোগ’ বলা হয়। চিকিৎসকরা একে সংক্ষেপে “Moans, Stones, Groans and Bones” বলে ব্যাখ্যা করেন:
-
কিডনি স্টোন (Stones): রক্তে অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম ফিল্টার করতে গিয়ে কিডনিতে পাথর তৈরি হওয়া।
-
হাড় ও জয়েন্টে ব্যথা (Bones): হাড় থেকে ক্যালসিয়াম বেরিয়ে যাওয়ায় হাড় পাতলা হয়ে যাওয়া (Osteoporosis) এবং হুটহাট ফ্র্যাকচার হওয়া।
-
পেটের সমস্যা (Groans): কোষ্ঠকাঠিন্য, বমি বমি ভাব এবং পেটে তীব্র অস্বস্তি বা প্যানক্রিয়াটাইটিস।
-
মানসিক ক্লান্তি (Moans): অতিরিক্ত অবসাদ, বিষণ্ণতা, ঘুমের সমস্যা এবং মনোযোগের অভাব।
কেন হয় এই সমস্যা?
১. প্রাইমারি হাইপারপ্যারাথাইরয়েডিজম: সাধারণত প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থিতে কোনো ছোট টিউমার (Adenoma) হলে এটি ঘটে। এটি ক্যানসার নয়, তবে হরমোন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়।
২. সেকেন্ডারি হাইপারপ্যারাথাইরয়েডিজম: শরীরে ভিটামিন D-এর মারাত্মক অভাব থাকলে বা কিডনি বিকল হলে শরীর রক্তে ক্যালসিয়াম বাড়াতে এই হরমোন ব্যবহার করে।
৩. বংশগতি: কিছু ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এই প্রবণতা থাকতে পারে।
প্যারাথাইরয়েড ও ব্রেন ফগ
সাম্প্রতিক নিউরোলজিক্যাল গবেষণায় দেখা গেছে, হাইপারপ্যারাথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের ‘কগনিটিভ ফাংশন’ মন্থর হয়ে যায়। উচ্চ ক্যালসিয়াম স্নায়বিক সংকেত পরিবহনে বাধা দেয়, যার ফলে রোগী সবসময় এক ধরণের ‘মানসিক কুয়াশা’ বা ব্রেন ফগের মধ্যে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে একে বার্ধক্যজনিত সমস্যা ভেবে ভুল করা হয়, যা আসলে একটি সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমেই পুরোপুরি সারিয়ে তোলা সম্ভব।
চিকিৎসা ও আধুনিক সমাধান
এই রোগের চিকিৎসা মূলত এর ধরণের ওপর নির্ভর করে:
-
পর্যবেক্ষণ ও ওষুধ: যদি ক্যালসিয়ামের মাত্রা খুব সামান্য বেশি থাকে, তবে নিয়মিত চেকআপ এবং ক্যালসিমাইমেটিক্স (Calcimimetics) জাতীয় ওষুধের মাধ্যমে হরমোন নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
-
অস্ত্রোপচার (Parathyroidectomy): প্রাইমারি হাইপারপ্যারাথাইরয়েডিজমের ক্ষেত্রে এটিই স্থায়ী সমাধান। আধুনিক পদ্ধতিতে ঘাড়ের খুব ছোট ছিদ্র দিয়ে (Minimally Invasive) আক্রান্ত গ্রন্থিটি বাদ দেওয়া হয়।
-
ভিটামিন D ও ক্যালসিয়াম ব্যালেন্স: সেকেন্ডারি ক্ষেত্রে ভিটামিন D-এর ঘাটতি পূরণ করলে অনেক সময় হরমোন স্বাভাবিক হয়ে আসে।
জীবনযাত্রায় যা জরুরি
-
পর্যাপ্ত জল পান: কিডনিতে পাথর হওয়া রোধ করতে প্রচুর জল পান করা উচিত।
-
ব্যায়াম: হাড় মজবুত রাখতে নিয়মিত হাঁটা বা হালকা ওয়েট-লিফ্টিং করা উপকারী।
-
সতর্কতা: ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া হুট করে ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট খাওয়া বন্ধ বা শুরু করবেন না, কারণ এটি রক্তে ক্যালসিয়ামের ভারসাম্য আরও বিগড়ে দিতে পারে।
বিশেষ পরামর্শ: যদি আপনার বারবার কিডনিতে পাথর হয় বা কোনো কারণ ছাড়াই হাড় ভাঙার প্রবণতা দেখা দেয়, তবে সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ‘সিরাম ক্যালসিয়াম’ এবং ‘PTH হরমোন’ পরীক্ষা করিয়ে নিন।
