x
d o c t o r s 2 4
19 Jan

পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি একটি জটিল স্নায়বিক অবস্থা যা আমাদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ড) এবং শরীরের বাকি অংশের মধ্যে সংযোগকারী স্নায়ুগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এটি মূলত কোনো একক রোগ নয়, বরং স্নায়ুর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির একটি ফলাফল। যখন এই স্নায়ুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন মস্তিষ্ক এবং হাত-পায়ের মধ্যে সংকেত আদান-প্রদান ব্যাহত হয়, যা জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথিও এক ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। নিচে এর কারণ, লক্ষণ এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

পেরিফেরাল স্নায়ুগুলো অনেকটা বৈদ্যুতিক তারের মতো কাজ করে। যদি এই তারগুলো ছিঁড়ে যায় বা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তবে সংকেত সঠিকভাবে পৌঁছাতে পারে না। এই সমস্যার মূলে রয়েছে আমাদের আধুনিক জীবনধারা এবং অলক্ষ্যে থাকা কিছু শারীরিক জটিলতা।

পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথির প্রধান কারণসমূহ

স্নায়ুর ক্ষতির পেছনে অনেকগুলো কারণ দায়ী থাকতে পারে:

  • ডায়াবেটিস: এটি নিউরোপ্যাথির সবচেয়ে বড় কারণ। উচ্চ রক্তচাপ এবং রক্তে দীর্ঘস্থায়ী চিনির আধিক্য স্নায়ুর সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলোকে ধ্বংস করে দেয়।

  • ভিটামিনের অভাব: বিশেষ করে ভিটামিন বি-১২, বি-১ এবং বি-৬-এর ঘাটতি স্নায়ুর রক্ষাকারী আবরণ (মায়েলিন) তৈরিতে বাধা দেয়।

  • অটোইমিউন রোগ: লুপাস বা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো রোগে শরীর নিজের স্নায়ুকে আক্রমণ করে।

  • বিষক্রিয়া ও ওষুধ: অতিরিক্ত মদ্যপান, ভারী ধাতু (যেমন- সিসা বা পারদ) এবং ক্যান্সারের কেমোথেরাপি স্নায়ুর স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।

৫টি প্রধান লক্ষণ যা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়

পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথির লক্ষণগুলো খুব সূক্ষ্মভাবে শুরু হয়:

১. অসাড়তা ও ঝিনঝিন: হাত বা পায়ের পাতায় মোজা বা দস্তানা পরে থাকার মতো অদ্ভুত অনুভূতি।

২. তীক্ষ্ণ বা জ্বালাপোড়া ব্যথা: মনে হতে পারে কেউ সূঁচ ফোঁটাচ্ছে বা আক্রান্ত স্থানে আগুন লেগেছে।

৩. পেশির দুর্বলতা: হাত দিয়ে কিছু ধরতে সমস্যা হওয়া বা হাঁটার সময় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা।

৪. অত্যধিক সংবেদনশীলতা: সামান্য স্পর্শ বা কাপড়ের ঘর্ষণেও অসহ্য ব্যথা অনুভব করা।

৫. অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অসাড়তা: পায়ের তলার অনুভূতি হারিয়ে ফেলা, যার ফলে জুতা খুলে গেলে বা পায়ে ক্ষত হলেও রোগী বুঝতে পারেন না।

‘স্মল ফাইবার’ নিউরোপ্যাথি ও আধুনিক স্ক্রিনিংসাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক রোগীর সাধারণ স্নায়ু পরীক্ষায় (EMG বা NCV) কোনো সমস্যা ধরা পড়ে না, কারণ তাদের ‘স্মল ফাইবার’ বা সূক্ষ্ম স্নায়ুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একে বলা হয় Small Fiber Neuropathy (SFN)। আধুনিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এখন ‘স্কিন বায়োপসি’ বা ‘কর্নিয়াল কনফোকাল মাইক্রোস্কোপি’ (চোখের কর্নিয়ার মাধ্যমে স্নায়ু পরীক্ষা) ব্যবহার করা হচ্ছে, যা এমআরআই-এর চেয়েও দ্রুত স্নায়ুর ক্ষতি শনাক্ত করতে পারে।

ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক চিকিৎসা

স্নায়ুর ক্ষতি একবার হয়ে গেলে তা পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন, তবে সঠিক ব্যবস্থাপনায় রোগটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব:

  • রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ: ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা স্নায়ুর পরবর্তী ক্ষতি রোধ করার প্রধান উপায়।

  • ওষুধ: স্নায়ুর ব্যথার জন্য সাধারণ পেইনকিলার কাজ করে না। চিকিৎসকরা সাধারণত অ্যান্টি-সিজার (গ্যাবাপেন্টিন) বা অ্যান্টি-ডিপ্রেশন জাতীয় বিশেষ ওষুধ ব্যবহার করেন যা ব্যথার সংকেত ব্লক করে।

  • ফিজিওথেরাপি ও টিইএনএস (TENS): ট্রান্সকুটেনিয়াস ইলেকট্রিক্যাল নার্ভ স্টিমুলেশন পদ্ধতিতে মৃদু বৈদ্যুতিক তরঙ্গের মাধ্যমে স্নায়ুকে উদ্দীপিত করা হয়।

  • পুষ্টিকর খাদ্য: বি-কমপ্লেক্স ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার এবং আলফা-লিপোয়িক অ্যাসিড (ALA) সমৃদ্ধ সাপ্লিমেন্ট স্নায়ুর পুনর্গঠনে সহায়তা করে।

সতর্কতা:

যাদের ডায়াবেটিস আছে, তারা প্রতিদিন আয়নার সাহায্যে পায়ের তলা পরীক্ষা করুন। ছোট কোনো ক্ষত বা ফুসকুড়ি যেন নজরে না এড়ায়। সঠিক সময়ে সচেতন হলে পঙ্গুত্বের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।

Leave A Comment