হান্টিংটনস ডিজিজ একটি বংশগত ও প্রগতিশীল স্নায়ুরোগ, যা ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশের কোষ ধ্বংস করে দেয়। এই রোগের মূল কারণ হলো HTT জিনে ত্রুটি, যার ফলে অস্বাভাবিক প্রোটিন তৈরি হয়ে মস্তিষ্কের নিউরন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে রোগটি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে, তবে গবেষণায় দেখা গেছে—রোগ নির্ণয়ের প্রায় ১–২ বছর আগেই শরীর ও আচরণে কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন শুরু হয়।
এই প্রাথমিক লক্ষণগুলো সময়মতো চিনতে পারলে চিকিৎসা পরিকল্পনা, মানসিক প্রস্তুতি ও জীবনব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
১. সূক্ষ্ম অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়ার শুরু
হান্টিংটনস ডিজিজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কোরিয়া—অর্থাৎ অনিচ্ছাকৃত, ঝাঁকুনিময় নড়াচড়া। রোগের ২ বছর আগে এই নড়াচড়া খুবই হালকা থাকে, যেমন—আঙুলে অদ্ভুত টান, মুখে অকারণ ভঙ্গি বা হাঁটার সময় সামান্য ছন্দপতন। অনেক সময় এটিকে নার্ভাসনেস বা অভ্যাসগত নড়াচড়া ভেবে উপেক্ষা করা হয়।
২. সূক্ষ্ম কাজের দক্ষতা কমে যাওয়া
কলম দিয়ে লেখা, বোতাম লাগানো, মোবাইলে টাইপ করার মতো সূক্ষ্ম কাজে ধীরে ধীরে ভুল বাড়তে পারে। আগে যেসব কাজে স্বাভাবিক সমন্বয় ছিল, সেগুলো করতে অস্বাভাবিক সময় লাগা হান্টিংটনসের প্রাথমিক মোটর সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
৩. মুড সুইং ও আচরণগত পরিবর্তন
রোগের আগাম পর্যায়ে মানসিক পরিবর্তন খুব সাধারণ একটি লক্ষণ। হঠাৎ রাগ বেড়ে যাওয়া, বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা অল্প কথায় বিরক্ত হয়ে পড়া দেখা যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই রোগে মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব আক্রান্ত হওয়ায় আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি হয়, যা অনেক সময় পরিবারে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি করে।
৪. মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির সূক্ষ্ম অবনতি
হান্টিংটনস ডিজিজের আগাম পর্যায়ে বড় ধরনের স্মৃতিভ্রংশ না হলেও মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হয়। নতুন তথ্য মনে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগে এবং একসঙ্গে একাধিক কাজ সামলানো কঠিন মনে হয়। এগুলো প্রায়ই কাজের চাপ বা মানসিক ক্লান্তির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়।
৫. কথা বলার গতি ও স্পষ্টতায় পরিবর্তন
২ বছর আগে থেকেই অনেকের কথার গতি অস্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে—কখনো খুব ধীরে, কখনো আবার শব্দ পরিষ্কারভাবে উচ্চারণ করতে কষ্ট হয়। দীর্ঘক্ষণ কথা বললে জিহ্বা ও মুখের পেশিতে ক্লান্তি দেখা দেয়, যা বালবার পেশির সূক্ষ্ম দুর্বলতার লক্ষণ।
৬. ভারসাম্য ও হাঁটার ভঙ্গিতে পরিবর্তন
হাঁটার সময় হঠাৎ হোঁচট খাওয়া, শরীরের ভারসাম্য ঠিক রাখতে না পারা বা চলার সময় হাত-পা অস্বাভাবিকভাবে দুলতে থাকা হান্টিংটনস ডিজিজের প্রাথমিক মোটর লক্ষণ হতে পারে। অনেকেই এটিকে বয়সজনিত সমস্যা ভেবে গুরুত্ব দেন না।
৭. ঘুমের সমস্যা ও সার্কাডিয়ান রিদমের বিঘ্ন
ঘুমাতে দেরি হওয়া, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া বা সকালে ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হওয়া এই রোগের আগাম পর্যায়ে দেখা যায়। গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে হান্টিংটনস ডিজিজ মস্তিষ্কের ঘুম নিয়ন্ত্রণকারী সার্কিটেও প্রভাব ফেলে।
৮. অকারণ ওজন কমে যাওয়া ও শক্তি হ্রাস
খাবারের পরিমাণ ঠিক থাকলেও ধীরে ধীরে ওজন কমে যাওয়া এবং সার্বিক শক্তি কমে যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। মেটাবলিক পরিবর্তন ও পেশির অকার্যকারিতার কারণে শরীর বেশি শক্তি খরচ করতে শুরু করে, যার ফলেই এই উপসর্গ দেখা দেয়।
জানা জরুরি:
হান্টিংটনস ডিজিজের এখনো সম্পূর্ণ নিরাময় নেই, তবে আগেভাগে শনাক্ত হলে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ, ফিজিওথেরাপি, স্পিচ থেরাপি ও মানসিক সহায়তার মাধ্যমে রোগীর জীবনমান উন্নত করা যায়। বিশেষ করে যাদের পরিবারে এই রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদের জন্য আগাম লক্ষণ জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যদি উপরের একাধিক লক্ষণ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং কয়েক মাস ধরে স্থায়ী হয়, তাহলে দেরি না করে একজন নিউরোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
