হৃদপিণ্ড শরীরের ইঞ্জিন হলেও এর ভেতরকার সুরক্ষা স্তরটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। যখন এই স্তরে কোনো জীবাণুর সংক্রমণ ঘটে, তখন তাকে বলা হয় এন্ডোকার্ডাইটিস। এটি সাধারণ কোনো অসুখ নয়, বরং জীবনঘাতী এক জরুরি অবস্থা।
আমাদের হৃদপিণ্ডের অভ্যন্তরীণ আস্তরণ এবং কপাটিকা বা ভালভগুলোতে যখন ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাসের সংক্রমণ ঘটে, তখন তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ইনফেক্টিভ এন্ডোকার্ডাইটিস (Infective Endocarditis) বলা হয়।
এটি মূলত রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে জীবাণু হৃদপিণ্ডে পৌঁছে সেখানে বাসা বাঁধার ফলে ঘটে। সময়মতো চিকিৎসা না করলে এটি হৃদপিণ্ডের ভালভ ধ্বংস করে দিতে পারে এবং হার্ট ফেইলিয়রের কারণ হতে পারে।
এন্ডোকার্ডাইটিস কেন হয়?
সাধারণত সুস্থ মানুষের হৃদপিণ্ডের আস্তরণ খুব মসৃণ হয়, যেখানে জীবাণু সহজে আটকে থাকতে পারে না। তবে হৃদপিণ্ডে আগে থেকে কোনো সমস্যা থাকলে রক্তে প্রবেশ করা জীবাণু সেখানে জমাট বাঁধতে শুরু করে। এই জীবাণুগুলো মূলত মুখগহ্বর (দাঁতের মাড়ি), নোংরা সূচ বা শরীরে থাকা কোনো ক্ষত থেকে রক্তে মিশে যায়।
প্রধান লক্ষণসমূহ
এন্ডোকার্ডাইটিসের লক্ষণগুলো অনেক সময় ফ্লু বা সাধারণ জ্বরের মতো মনে হতে পারে, যা বিভ্রান্তি তৈরি করে:
-
টানা জ্বর ও কাঁপুনি: অনেক দিন ধরে জ্বরের ভাব থাকা যা সহজে সারে না।
-
হৃদপিণ্ডে নতুন শব্দ (Heart Murmur): স্টেথোস্কোপ দিয়ে পরীক্ষা করলে হৃদপিণ্ডের স্পন্দনে অস্বাভাবিক শব্দ পাওয়া যায়।
-
ত্বকের পরিবর্তন: আঙুলের ডগায় ছোট লাল বা বেগুনি দাগ (Osler’s nodes) বা হাতের তালুতে রক্ত জমাট বাঁধার মতো দাগ (Janeway lesions)।
-
চরম ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্ট: সামান্য পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠা।
-
রাতে ঘাম হওয়া: ঘুমানোর সময় শরীর অস্বাভাবিক ভিজে যাওয়া।
ঝুঁকির মুখে কারা?
সবাই এই রোগে আক্রান্ত হয় না। কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে:
-
যাদের হৃদপিণ্ডে কৃত্রিম ভালভ (Artificial Valve) লাগানো আছে।
-
জন্মগতভাবে হৃদপিণ্ডে ছিদ্র বা কোনো ত্রুটি থাকলে।
-
যারা শিরায় মাদক গ্রহণ করেন বা দূষিত সূচ ব্যবহার করেন।
-
ডায়ালাইসিস নিচ্ছেন এমন রোগী।
-
যাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল।
ওরাল হাইজিন এবং হার্ট অ্যাটাক
সাম্প্রতিক গবেষণায় একটি চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে—দাঁতের অপরিচ্ছন্নতা বা মাড়ির রোগ এন্ডোকার্ডাইটিসের ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। এমনকি সাধারণ দাঁত তোলার সময় বা স্কেলিং করার সময়ও রক্তে প্রচুর ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করতে পারে। যারা হৃদরোগে ভুগছেন, তাদের জন্য এখন ডেন্টিস্টের কাছে যাওয়ার আগে অ্যান্টিবায়োটিক প্রোফাইল্যাক্সিস (অগাম ওষুধ) নেওয়া বাধ্যতামূলক বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
এন্ডোকার্ডাইটিস শনাক্ত হলে রোগীকে সাধারণত হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।
-
অ্যান্টিবায়োটিক থেরাপি: সংক্রমণের ধরণ অনুযায়ী উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক শিরায় (IV) প্রয়োগ করা হয়, যা ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে।
-
অস্ত্রোপচার: যদি ওষুধের মাধ্যমে সংক্রমণ না কমে বা ভালভ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে সার্জারির মাধ্যমে ভালভ মেরামত বা পরিবর্তন করতে হয়।
প্রতিরোধে করণীয়:
-
দাঁত ও মাড়ির সুস্বাস্থ্য বজায় রাখা।
-
শরীরে কোনো ক্ষত বা ইনফেকশন হলে তা অবহেলা না করা।
-
ট্যাটু করানো বা বডি পিয়ার্সিং-এর ক্ষেত্রে জীবাণুমুক্ত সূচ নিশ্চিত করা।
বিশেষ সতর্কবার্তা: যদি আপনার আগে থেকেই কোনো হার্ট সার্জারি হয়ে থাকে এবং আপনি টানা এক সপ্তাহের বেশি জ্বরে ভোগেন, তবে দেরি না করে দ্রুত কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শ নিন।
