মাল্টিপল মাইলোমা একটি রক্তের ক্যানসার যা অস্থিমজ্জার প্লাজমা সেল বা শ্বেত রক্তকণিকাকে আক্রমণ করে। এই রোগটি নীরব ঘাতকের মতো; চিকিৎসকদের মতে, রোগ নির্ণয়ের প্রায় ১ বছর আগে থেকেই শরীরে কিছু সূক্ষ্ম লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। অথচ, সাধারণ মানুষ সেগুলোকে বার্ধক্যজনিত সমস্যা বা সাধারণ দুর্বলতা ভেবে অবহেলা করেন।
সঠিক সময়ে সচেতন হলে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। নিচে মাল্টিপল মাইলোমার ৭টি লক্ষণ তুলে ধরা হলো, যা অনেকেই প্রায় এক বছর ধরে অনুভব করেন কিন্তু গুরুত্ব দেন না।
রোগটি যখন ধরা পড়ে, তখন অনেকের ক্ষেত্রেই বেশ দেরি হয়ে যায়। অথচ শরীর অনেক আগে থেকেই কিছু সংকেত দিতে থাকে। লক্ষণগুলো মিলিয়ে নিন:
১. দীর্ঘস্থায়ী হাড়ের ব্যথা (Persistent Bone Pain)
মাইলোমার সবচেয়ে প্রাথমিক ও সাধারণ লক্ষণ হলো হাড়ে ব্যথা। বিশেষ করে পিঠ, কোমর, পাঁজর বা মেরুদণ্ডে দীর্ঘস্থায়ী ভোঁতা ব্যথা হতে পারে। অনেকেই একে সাধারণ বাত ব্যথা বা আর্থ্রাইটিস ভেবে ভুল করেন। যদি কোনো ব্যথা সাধারণ পেইনকিলারে না কমে এবং ১ মাসের বেশি স্থায়ী হয়, তবে সতর্ক হোন।
২. ব্যাখ্যাতীত ক্লান্তি ও দুর্বলতা (Unexplained Fatigue)
কাজের চাপ ছাড়াই যদি আপনি সারাদিন প্রচণ্ড ক্লান্ত বোধ করেন, তবে এটি রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়ার লক্ষণ হতে পারে। মাইলোমা কোষগুলো অস্থিমজ্জায় সুস্থ লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে বাধা দেয়। ফলে রোগ নির্ণয়ের অনেক আগে থেকেই রোগী সিঁড়ি ভাঙতে বা সামান্য পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে ওঠেন।
৩. বারবার সংক্রমণ বা জ্বর (Frequent Infections)
শরীরে হঠাৎ করে ঘন ঘন ঠান্ডা, কাশি বা জ্বর হচ্ছে? মাইলোমা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়, ফলে সাধারণ ফ্লু বা নিউমোনিয়া থেকে সেরে উঠতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগে। বছরে একাধিকবার অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হলে এটি বিপদের বার্তা হতে পারে।
৪. অস্বাভাবিক তৃষ্ণা ও ঘন ঘন প্রস্রাব (Extreme Thirst & Urination)
মাইলোমার কারণে হাড় ক্ষয় হয়ে রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বেড়ে যায় (Hypercalcemia)। এর ফলে রোগীর প্রচণ্ড পানি পিপাসা পায় এবং ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হয়। এই লক্ষণটি ডায়াবেটিসের মতো মনে হলেও, এর সাথে হাড়ের ব্যথা থাকলে তা মাইলোমার দিকে ইঙ্গিত করে।
৫. হাত-পা অবশ বা ঝিনঝিন করা (Numbness or Tingling)
কখনো কখনো মেরুদণ্ডের হাড় দুর্বল হয়ে স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এতে হাত-পায়ে ঝিনঝিন ধরা, অবশ ভাব বা ‘পিন ফোটার’ মতো অনুভূতি হতে পারে। একে ডাক্তারি ভাষায় নিউরোপ্যাথি বলা হয়।
৬. বমি বমি ভাব ও কোষ্ঠকাঠিন্য (Nausea & Constipation)
রক্তে অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম বা কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে হজমে গণ্ডগোল দেখা দেয়। দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য, খাবারে অরুচি এবং প্রায়ই বমি বমি ভাব—এগুলো মাইলোমার প্রাথমিক সতর্কবার্তা হতে পারে, যা অনেকেই গ্যাস্ট্রিক ভেবে এড়িয়ে যান।
৭. মানসিক বিভ্রান্তি বা ‘ব্রেন ফগ’ (Mental Confusion)
রক্তে ক্যালসিয়ামের আধিক্য এবং ক্যানসার কোষের প্রভাবে রক্ত ঘন হয়ে যাওয়ায় মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালনে বাধা সৃষ্টি হয়। এতে রোগী প্রায়ই বিভ্রান্ত বোধ করেন, মনোযোগ কমে যায় এবং ঝিমুনি ভাব দেখা দেয়।
কেন ‘১ বছর’ সময়টি গুরুত্বপূর্ণ?
গবেষণায় দেখা গেছে, মাইলোমা রোগীদের একটি বড় অংশ রোগ নির্ণয়ের ৬ মাস থেকে ১ বছর আগে থেকেই চিকিৎসকের কাছে পিঠ ব্যথা বা দুর্বলতার জন্য গিয়ে থাকেন, কিন্তু সঠিক পরীক্ষা না করায় রোগটি ধরা পড়ে না। একে বলা হয় ‘Smoldering Myeloma’ বা সুপ্ত অবস্থা। এই সময়ে সাধারণ রক্ত পরীক্ষা (CBC) বা কিডনি ফাংশন টেস্টে সামান্য পরিবর্তন দেখেও রোগটি সন্দেহ করা সম্ভব।
আপনার যা করণীয়
যদি আপনার বয়স ৪৫-এর বেশি হয় এবং উপরের লক্ষণগুলোর মধ্যে একাধিক লক্ষণ একনাগাড়ে দেখা দেয়, তবে অবহেলা করবেন না।
-
সিরাম ক্যালসিয়াম টেস্ট: রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা দেখুন।
-
ইলেক্ট্রোফোরেসিস টেস্ট: এটি রক্তের প্রোটিন বিশ্লেষণ করে মাইলোমা শনাক্ত করতে পারে।
-
এক্স-রে বা এমআরআই: হাড়ের কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কিনা তা যাচাই করুন।
মনে রাখবেন, মাইলোমা পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য না হলেও, প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে সঠিক চিকিৎসায় রোগী দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারেন।
