x
d o c t o r s 2 4
05 Nov

গরমের দিনে বা কঠোর অনুশীলনের পর স্পোর্টস ড্রিংক হাতে নিয়ে অনেকেই স্বস্তি খুঁজে পান। বিজ্ঞাপনেও আমরা দেখি—এক চুমুকেই শরীরে শক্তি ফিরে আসে, ঘাম ঝরানোর ক্লান্তি দূর হয়। কিন্তু আসলেই কি স্পোর্টস ড্রিংক এতটা কার্যকর? এই পানীয়গুলোর পেছনের বিজ্ঞান ও এর প্রকৃত উপকারিতা জানলে হয়তো আমাদের ধারণা আরও পরিষ্কার হবে।

স্পোর্টস ড্রিংক কীভাবে কাজ করে

স্পোর্টস ড্রিংক মূলত এমন এক ধরনের পানীয় যা শরীরের ইলেক্ট্রোলাইট (যেমন সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি) ও কার্বোহাইড্রেট পুনরায় পূরণ করতে সাহায্য করে। তীব্র ব্যায়াম, খেলাধুলা বা অতিরিক্ত গরমের কারণে যখন আমরা ঘামি, তখন শুধু পানি নয়, এসব গুরুত্বপূর্ণ খনিজও শরীর থেকে বেরিয়ে যায়।

ইলেক্ট্রোলাইট হলো শরীরের সেই খনিজ পদার্থ, যা বৈদ্যুতিকভাবে চার্জযুক্ত এবং কোষের ভেতর ও বাইরে পানির ভারসাম্য বজায় রাখে। এর অভাবে শরীরে ডিহাইড্রেশন, পেশীতে টান, এমনকি হৃদস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে।

হাইড্রেশনের বৈজ্ঞানিক দিক

যখন শরীর ঘামের মাধ্যমে অতিরিক্ত পানি হারায়, তখন শুধু পানি পান করলেই সমস্যা মিটে যায় না। কারণ শুধু পানি শরীরের লবণ ও খনিজ ঘাটতি পূরণ করতে পারে না। এখানে স্পোর্টস ড্রিংক একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী হিসেবে কাজ করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি ব্যায়ামের সময় (৬০ মিনিট বা তার বেশি) স্পোর্টস ড্রিংক শরীরে তরল ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ায় এবং ক্লান্তি কমায়। কারণ এতে থাকা কার্বোহাইড্রেট দ্রুত শক্তি জোগায় এবং ইলেক্ট্রোলাইট ঘাটতি পূরণ করে।

সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, সব স্পোর্টস ড্রিংক সমান কার্যকর নয়। অনেক বাণিজ্যিক পানীয়তে অতিরিক্ত চিনি ও কৃত্রিম রং ব্যবহার করা হয়, যা সাধারণ মানুষের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। গবেষকরা এখন “লো-সুগার স্পোর্টস ড্রিংক” ও “ন্যাচারাল ইলেক্ট্রোলাইট ড্রিংক” নিয়ে কাজ করছেন, যাতে প্রাকৃতিক উপাদান যেমন নারিকেল পানি, লেবু, মধু, ও সমুদ্রলবণ ব্যবহার করা হয়।

ব্রিটিশ জার্নাল অব নিউট্রিশনের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারিকেল পানি প্রকৃতির সেরা প্রাকৃতিক স্পোর্টস ড্রিংকগুলোর একটি, কারণ এতে প্রাকৃতিক ইলেক্ট্রোলাইটের পাশাপাশি অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও রয়েছে। এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং শরীরের কোষ পুনরুজ্জীবিত করে।

কাদের জন্য স্পোর্টস ড্রিংক প্রয়োজন?

সবাইয়ের জন্য স্পোর্টস ড্রিংক প্রয়োজন নয়। চিকিৎসকরা বলেন, যারা নিয়মিত জিমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যায়াম করেন, পেশাদার খেলোয়াড়, বা প্রচণ্ড গরমে বাইরে কাজ করেন, তাদের জন্য এগুলো কার্যকর হতে পারে।

অন্যদিকে, সাধারণ দৈনন্দিন জীবনে যারা হালকা ব্যায়াম করেন বা কম ঘামেন, তাদের জন্য পানি-ই যথেষ্ট। অতিরিক্ত স্পোর্টস ড্রিংক গ্রহণে শরীরে অতিরিক্ত চিনি প্রবেশ করে, যা স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও দাঁতের ক্ষয় বাড়াতে পারে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

স্পোর্টস ড্রিংক কেনার সময় লেবেল দেখে নেওয়া জরুরি—প্রতি বোতলে কত পরিমাণ চিনি ও সোডিয়াম আছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রতি ১০০ মিলিলিটার স্পোর্টস ড্রিংকে চিনি ৪–৮ গ্রাম এবং সোডিয়াম ৪০–৮০ মিলিগ্রাম থাকা উচিত। এর বেশি হলে তা স্বাস্থ্যকর নয়।

অন্যদিকে, বাড়িতে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি স্পোর্টস ড্রিংকও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এক গ্লাস পানিতে লেবুর রস, সামান্য লবণ ও এক চা চামচ মধু মিশিয়ে নেওয়া—এটি শরীরে দ্রুত শক্তি ও ইলেক্ট্রোলাইট ফেরাতে পারে, কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই।

স্পোর্টস ড্রিংক নিঃসন্দেহে আধুনিক জীবনযাপনের এক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার, বিশেষ করে ক্রীড়াবিদদের জন্য। তবে এটি কোনো “জাদুকরী পানীয়” নয়। সঠিক পরিস্থিতিতে, সঠিক মাত্রায় এবং সচেতনভাবে গ্রহণ করলেই এটি শরীরের হাইড্রেশন ও শক্তি পুনরুদ্ধারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

Leave A Comment