নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের অন্যতম জটিল ও বেদনাদায়ক সমস্যা হলো এন্ডোমেট্রিওসিস (Endometriosis)। এটি এমন একটি অবস্থা, যেখানে জরায়ুর ভেতরের স্তর (Endometrium) জরায়ুর বাইরে — যেমন ডিম্বাশয়, ফলোপিয়ান টিউব বা পেলভিক অঞ্চলে — অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এর ফলে প্রচণ্ড পেটব্যথা, অনিয়মিত মাসিক, এমনকি বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকিও তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, এন্ডোমেট্রিওসিস হঠাৎ করে দেখা দেয় না। রোগটি শুরু হওয়ার প্রায় ২ মাস আগেই শরীরে কিছু সতর্ক সংকেত দেখা দিতে থাকে, যা অনেক নারী সাধারণ পেটব্যথা বা হরমোন সমস্যা ভেবে উপেক্ষা করেন।
চলুন জেনে নেওয়া যাক—এন্ডোমেট্রিওসিসের ২ মাস আগে শরীরে দেখা দিতে পারে এমন ৮টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ:
১. মাসিকের আগে বা চলাকালে তীব্র ব্যথা
এন্ডোমেট্রিওসিসের সবচেয়ে সাধারণ এবং প্রাথমিক লক্ষণ হলো মাসিকের আগে বা চলাকালে তীব্র পেটব্যথা।
- ব্যথা কেবল পেটে নয়, কোমর, পিঠ বা উরুতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
- ব্যথা সাধারণ মাসিক ব্যথার চেয়ে বেশি তীব্র এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়।
এই ব্যথা প্রায়ই শুরু হয় রোগটি পুরোপুরি ধরা পড়ার কয়েক মাস আগেই।
২. অনিয়মিত বা ভারী রক্তপাত
রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক নারী অনিয়মিত মাসিক বা অতিরিক্ত রক্তপাত (Menorrhagia) অনুভব করেন।
- মাসিকের সময় রক্তের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেশি হয়
- মাঝে মাঝে রক্তপাতের বিরতি কমে যায়
- মাসিকের মাঝেও হালকা রক্তক্ষরণ হতে পারে
এটি জরায়ুর ভেতরের টিস্যুর অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ইঙ্গিত হতে পারে।
৩. পেট ফেঁপে যাওয়া ও হজমের সমস্যা
এন্ডোমেট্রিওসিস শুধু প্রজনন অঙ্গেই নয়, অন্ত্রের আশপাশেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে দেখা দেয়—
- পেট ফাঁপা, গ্যাস, কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া
- খাবার খেলে দ্রুত পেট ভরে যাওয়া
- পেটে ভারীভাব অনুভব
এই লক্ষণগুলো অনেক সময় রোগের আগাম ইঙ্গিত হিসেবে দেখা দেয়, বিশেষ করে মাসিকের আগে।
৪. যৌনমিলনের সময় বা পরে ব্যথা
এন্ডোমেট্রিওসিসের অন্যতম উপেক্ষিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো যৌনমিলনের সময় বা পরে তীব্র ব্যথা (Dyspareunia)।
এই ব্যথা জরায়ু ও আশপাশের টিস্যুতে প্রদাহজনিত কারণে হয়। যদি এটি নিয়মিত হয়, তাহলে তা রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।
৫. মলত্যাগ বা প্রস্রাবে ব্যথা
যদি এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যু ব্লাডার বা অন্ত্রের কাছাকাছি বৃদ্ধি পায়, তাহলে—
- প্রস্রাবের সময় জ্বালা
- মলত্যাগে ব্যথা
- মাঝে মাঝে প্রস্রাবে বা মলে রক্ত দেখা যায়
এই উপসর্গগুলো সাধারণ সংক্রমণ নয়, বরং গভীর স্তরের এন্ডোমেট্রিওসিসের ইঙ্গিত।
৬. ক্লান্তি ও শক্তির ঘাটতি
হরমোন ভারসাম্য নষ্ট হওয়া ও প্রদাহের কারণে শরীরের শক্তি দ্রুত ক্ষয় হয়। ফলে অনেক নারী অতিরিক্ত ক্লান্তি, ঘুম ঘুম ভাব ও মনোযোগের অভাব অনুভব করেন। এটি রোগের ১–২ মাস আগেই প্রকাশ পেতে শুরু করে।
৭. মানসিক অস্থিরতা ও বিষণ্ণতা
হরমোনের ওঠানামা ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার কারণে উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা বা মুড সুইং দেখা দিতে পারে। অনেক নারী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, যা এন্ডোমেট্রিওসিসের প্রাথমিক পর্যায়েই শুরু হতে পারে।
৮. ওজন পরিবর্তন ও হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট
রোগটির সঙ্গে ইস্ট্রোজেন হরমোনের বৃদ্ধি যুক্ত থাকে, যা ওজন বাড়িয়ে দিতে পারে বা হঠাৎ কমিয়ে দেয়।
এছাড়াও মুখে ব্রণ, ত্বক তেলতেলে হওয়া, বা চুল পড়ার মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
বাংলাদেশ গাইনোকোলজি সোসাইটির তথ্যমতে, দেশে প্রজননক্ষম নারীদের মধ্যে প্রায় ১০ জনে ১ জন এন্ডোমেট্রিওসিসে ভোগেন, কিন্তু অনেকেই তা বুঝতে পারেন না।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—
- মাসিকের ব্যথা অস্বাভাবিক মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
- আল্ট্রাসনোগ্রাম ও ল্যাপারোস্কপি টেস্ট করান
- সুষম খাবার ও নিয়মিত ব্যায়াম করুন
- মানসিক চাপ ও দেরিতে ঘুমানো এড়িয়ে চলুন
এন্ডোমেট্রিওসিস কেবল ব্যথার রোগ নয়—এটি নারীর প্রজনন ক্ষমতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও জড়িত। তাই শরীরে এই ৮টি সতর্ক সংকেত দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
