ট্যাবলেট বা ইনজেকশন নয়, বরং মস্তিষ্কের স্নায়ুকে বৈদ্যুতিক তরঙ্গের মাধ্যমে উদ্দীপিত করে সারিয়ে তোলা হবে বিষণ্ণতা কিংবা বছরের পর বছর বয়ে বেড়ানো তীব্র ব্যথা। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিস্ময়কর উদ্ভাবন ‘নিউরো স্টিমুলেশন’ এখন মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা এবং পেইন ম্যানেজমেন্ট বা ব্যথা ব্যবস্থাপনায় বিশ্বজুড়ে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে যারা বিষণ্ণতা (Depression), এনজাইটি বা ক্রনিক ব্যথায় ভুগছেন এবং প্রচলিত ওষুধে যাদের কোনো ফল মিলছে না, তাদের জন্য নিউরোস্টিমুলেশন এক জাদুকরী সমাধান। এটি মূলত এমন একটি প্রযুক্তি যা মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়বিক সার্কিট বা মেরুদণ্ডের স্নায়ুতে মৃদু বৈদ্যুতিক স্পন্দন পাঠিয়ে সেগুলোর কার্যকারিতা পরিবর্তন করে দেয়। সহজ কথায়, এটি শরীরের নিজস্ব ‘ইলেকট্রিক্যাল নেটওয়ার্ক’ মেরামত করার একটি আধুনিক পদ্ধতি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের মস্তিষ্ক এবং স্নায়ুতন্ত্র মূলত বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে কাজ করে। যখন এই সংকেতের আদান-প্রদান ব্যাহত হয়, তখনই জন্ম নেয় মানসিক রোগ কিংবা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা। নিউরো স্টিমুলেশন পদ্ধতিতে কোনো বড় অস্ত্রোপচার ছাড়াই বাইরে থেকে (Non-invasive) কিংবা ক্ষুদ্র ডিভাইসের মাধ্যমে ভেতর থেকে স্নায়ুকে পুনরায় সচল করা হয়। এটি অনেকটা হার্টের ‘পেসমেকার’-এর মতো, যা হার্টের বদলে মস্তিষ্ক বা স্নায়ুকে সঠিক ছন্দে ফিরিয়ে আনে।
নিউরো স্টিমুলেশনের বিশেষ প্রয়োগ ও সম্ভাবনা:
এই প্রযুক্তির বহুমুখী কার্যকারিতা চিকিৎসা বিজ্ঞানের চিরাচরিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এর মূল স্তম্ভগুলো হলো:
-
বিষণ্ণতা ও ওসিডি নিরাময়: টিএমএস (Transcranial Magnetic Stimulation)-এর মতো পদ্ধতির মাধ্যমে মস্তিষ্কের মুড নিয়ন্ত্রণকারী অংশে উদ্দীপনা দিয়ে গভীর বিষণ্ণতা কাটানো সম্ভব হচ্ছে।
-
ব্যথা ব্যবস্থাপনা: স্পাইনাল কর্ড স্টিমুলেশন পদ্ধতিতে মেরুদণ্ডে বিশেষ ইলেকট্রোড বসিয়ে ব্যথার সংকেতকে মস্তিষ্কে পৌঁছানোর আগেই থামিয়ে দেওয়া হয়। ফলে মাইগ্রেন বা ক্যানসারজনিত তীব্র ব্যথাতেও রোগী আরাম পান।
-
পারকিনসনস ও মৃগীরোগ নিয়ন্ত্রণ: ডিবিএস (Deep Brain Stimulation) পদ্ধতিতে মস্তিষ্কের গভীরে উদ্দীপনা দিয়ে হাত-পায়ের কাঁপুনি বা খিঁচুনি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে।
-
স্মৃতিশক্তি ও একাগ্রতা বৃদ্ধি: আলঝেইমার্স রোগীদের ক্ষেত্রে স্নায়বিক সংযোগ পুনর্গঠনে এই প্রযুক্তি আশার আলো দেখাচ্ছে।
বাংলাদেশেও এখন উচ্চবিত্ত ও সচেতন মহলে এই চিকিৎসার চাহিদা বাড়ছে। বিশেষ করে পেইন ক্লিনিকগুলোতে দীর্ঘমেয়াদী কোমর বা ঘাড় ব্যথার চিকিৎসায় নিউরো স্টিমুলেশন এখন ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এর ব্যাপক প্রয়োগ এখনো অনেকটা সীমিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (BSMMU) এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি এই প্রযুক্তির দেশীয় প্রসার ঘটায়, তবে হাজার হাজার রোগীকে ওষুধের দীর্ঘমেয়াদী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো এর কার্যকারিতা তাৎক্ষণিক এবং এটি আসক্তিমুক্ত। যেখানে ব্যথানাশক ওষুধ খেলে লিভার বা কিডনির ক্ষতির ভয় থাকে, সেখানে নিউরো স্টিমুলেশন সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে কাজ করতে সক্ষম।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই ধারা প্রমাণ করেছে যে, মানুষের শরীর আসলে একটি চমৎকার জৈবিক যন্ত্র। নিউরোস্টিমুলেশন কেবল একটি চিকিৎসা পদ্ধতি নয়, এটি পক্ষাঘাতগ্রস্তদের সক্ষমতা আর বিষণ্ণতায় ডুবে থাকা মানুষের হাসিমুখ ফিরিয়ে দেওয়ার এক কারিগর। ভবিষ্যতে হয়তো পকেট সাইজ ডিভাইসের মাধ্যমেই মানুষ নিজের মানসিক প্রশান্তি আর শারীরিক যন্ত্রণাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। বিজ্ঞানের এই জয়যাত্রা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো ওষুধের প্রেসক্রিপশন কমে যাবে, আর বাড়বে স্নায়বিক উদ্দীপনার মাধ্যমে প্রাকৃতিক নিরাময়।
