পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ (PKD) একটি বংশগত বা জেনেটিক ব্যাধি, যেখানে কিডনিতে অসংখ্য সিস্ট বা তরল পূর্ণ থলি তৈরি হয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী রোগ যা ধীরে ধীরে কিডনির কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। তবে ২০২৬ সালের আধুনিক নেফ্রোলজি (কিডনি বিজ্ঞান) গবেষণা বলছে, কিডনি বিকল হওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ের অন্তত ১ বছর আগে শরীর কিছু বিশেষ সংকেত দিতে শুরু করে।
প্রাথমিক অবস্থায় এই লক্ষণগুলো শনাক্ত করতে পারলে ডায়েট এবং লাইফস্টাইল পরিবর্তনের মাধ্যমে ডায়ালাইসিস বা ট্রান্সপ্লান্টের সময়কাল অনেক বছর পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব। পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজের সেই আগাম ৫টি লক্ষণ নিয়ে আজকের প্রতিবেদন।
পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ সাধারণত নীরবে বাড়ে। কিন্তু সিস্টগুলো যখন আকারে বড় হতে থাকে এবং সুস্থ টিস্যুকে চাপ দেয়, তখন শরীরে এমন কিছু পরিবর্তন আসে যা আমরা অনেক সময় সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাই।
১. অস্পষ্ট পিঠ বা পাশের ব্যথা (Flank Pain)
কিডনি যেহেতু পেটের পেছনের দিকে থাকে, তাই সিস্টের আকার বাড়লে কোমরের ঠিক ওপরে বা দুই পাশে (Flank) এক ধরণের ভোঁতা ব্যথা অনুভূত হয়। এটি কোনো চোট বা মচকানোর ব্যথা নয়, বরং একটি স্থায়ী অস্বস্তি। গবেষণায় দেখা গেছে, রোগের তীব্রতা বাড়ার প্রায় এক বছর আগে থেকেই রোগীরা মাঝেমধ্যে এই ব্যথার কথা জানান, যা বিশ্রাম নিলেও পুরোপুরি সারে না।
২. বারবার উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা (Hypertension)
পিকেডি-র অন্যতম প্রাথমিক উপসর্গ হলো উচ্চ রক্তচাপ। কিডনির রক্তনালীগুলোতে সিস্টের চাপের কারণে শরীর ‘রেনিন’ নামক হরমোন বেশি নিঃসরণ করে, যা রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। আপনার যদি আগে রক্তচাপ স্বাভাবিক থেকে থাকে এবং হঠাৎ করে তা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে, তবে এটি কিডনির সমস্যার একটি বড় সংকেত হতে পারে।
৩. প্রস্রাবের রঙ পরিবর্তন বা রক্তক্ষরণ (Hematuria)
সিস্টগুলো যখন ফেটে যায় বা বড় হয়, তখন রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রস্রাবের সাথে রক্ত আসতে পারে। অনেক সময় রক্ত খালি চোখে দেখা যায় না, তবে প্রস্রাবের রঙ গাঢ় চা বা কোলার মতো মনে হতে পারে। ১ বছর আগে থেকেই এই লক্ষণটি মাঝেমধ্যে দেখা দিয়ে আবার মিলিয়ে যেতে পারে।
৪. তলপেট বড় হয়ে যাওয়া বা ফোলা ভাব
অনেক সময় সিস্টের কারণে কিডনির আকার স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বড় হয়ে যায়। এতে পেট সামান্য ফুলে যেতে পারে বা ওজন না বাড়লেও প্যান্টের কোমর টাইট মনে হতে পারে। রোগীরা প্রায়ই একে ‘গ্যাসের সমস্যা’ বা ‘পেট ফাপা’ মনে করেন, কিন্তু আসলে এটি বড় হয়ে যাওয়া কিডনির চাপ।
৫. বারবার ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI)
কিডনিতে সিস্ট থাকলে সেখানে ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর ঝুঁকি বেড়ে যায়। ফলে রোগী বারবার প্রস্রাবের সংক্রমণে ভোগেন। ২০২৬ সালের আধুনিক ক্লিনিকাল ডেটা বলছে, যদি বছরে তিনবারের বেশি ইউটিআই হয় এবং পরিবারে কিডনি রোগের ইতিহাস থাকে, তবে তাকে গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত।
সিস্টের বৃদ্ধি থামানোর উপায়
আধুনিক চিকিৎসায় এখন ‘Tolvaptan’ নামক ওষুধের সঠিক ব্যবহার এবং প্রচুর পরিমাণে পানি পানের মাধ্যমে সিস্ট বড় হওয়ার গতি ধীর করা হচ্ছে। এছাড়া নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ‘কেটোজেনিক’ বা লো-কার্ব ডায়েট কিছু ক্ষেত্রে সিস্টের বৃদ্ধি কমাতে সহায়ক হতে পারে (তবে এটি অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে করতে হবে)।
করণীয় ও রোগ নির্ণয়
যদি আপনার পরিবারে কারও এই রোগ থেকে থাকে, তবে লক্ষণ প্রকাশের অপেক্ষা না করে স্ক্রিনিং করা জরুরি:
-
আল্ট্রাসাউন্ড: এটি সবচেয়ে সহজ ও কার্যকরী পদ্ধতি।
-
সিটি স্ক্যান বা এমআরআই: সিস্টের সংখ্যা ও আকার নিখুঁতভাবে বুঝতে সাহায্য করে।
-
জেনেটিক টেস্টিং: পরিবারের সদস্যদের ঝুঁকি বুঝতে এটি করা হয়।
পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ মানেই জীবন থমকে যাওয়া নয়। ১ বছর আগের এই সংকেতগুলো চিনে নিয়ে নিয়মিত রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, কম লবণযুক্ত খাবার এবং পর্যাপ্ত পানি পান করলে দীর্ঘদিন সুস্থ থাকা সম্ভব। নিজের শরীরের সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলোকে অবহেলা করবেন না।
