হৃদপিণ্ডের চারপাশ ঘিরে থাকে পাতলা দুই স্তরের একটি আবরণ, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয় ‘পেরিকার্ডিয়াম’। যখন কোনো কারণে এই আবরণে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন তৈরি হয়, তখন তাকে বলা হয় পেরিকার্ডাইটিস। এটি বুক ব্যথার একটি অন্যতম প্রধান কারণ, যা অনেক সময় হার্ট অ্যাটাক ভেবে ভুল করা হয়। যদিও এটি হার্ট অ্যাটাকের মতো প্রাণঘাতী নয়, তবে অবহেলা করলে এটি হৃদপিণ্ডের স্বাভাবিক রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত করতে পারে।
নিচে পেরিকার্ডাইটিস এর কারণ, আগাম লক্ষণ এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
পেরিকার্ডাইটিস হঠাৎ করে দেখা দিতে পারে (অ্যাকিউট) অথবা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে (ক্রনিক)। এটি মূলত তখন ঘটে যখন হৃদপিণ্ডের রক্ষাকারী ঝিল্লি দুটি ফুলে যায় এবং একে অপরের সাথে ঘষা খায়, যার ফলে বুকে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়।
পেরিকার্ডাইটিসের প্রধান লক্ষণসমূহ
পেরিকার্ডাইটিসের লক্ষণগুলো বেশ স্বতন্ত্র, যা একে সাধারণ হার্ট অ্যাটাক থেকে আলাদা করতে সাহায্য করে:
-
তীক্ষ্ণ বুক ব্যথা: বুকের মাঝখানে বা বাম পাশে ছুরিকাঘাতের মতো তীব্র ব্যথা হওয়া। এই ব্যথা প্রায়ই কাঁধ বা ঘাড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
-
অবস্থান পরিবর্তনের সাথে ব্যথার পরিবর্তন: এটি পেরিকার্ডাইটিসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। রোগী যখন সোজা হয়ে বসেন বা সামনের দিকে ঝুঁকে থাকেন, তখন ব্যথা কমে। কিন্তু শুয়ে থাকলে বা গভীর শ্বাস নিলে ব্যথা তীব্রতর হয়।
-
শুকনো কাশি ও ক্লান্তি: অনেক সময় মৃদু জ্বর, শুকনো কাশি এবং শরীর ম্যাজম্যাজ করার মতো লক্ষণ দেখা দেয়।
-
দ্রুত হৃদস্পন্দন: হৃদপিণ্ডের গতি স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাওয়া বা বুক ধড়ফড় করা।
প্রদাহের নেপথ্যে কারণ কী?
পেরিকার্ডাইটিস কেন হয়, তার নির্দিষ্ট কারণ অনেক সময় খুঁজে পাওয়া যায় না (ইডিওপ্যাথিক)। তবে সাধারণ কারণগুলো হলো:
১. ভাইরাল ইনফেকশন: ইনফ্লুয়েঞ্জা বা সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ পরবর্তী জটিলতা হিসেবে এটি দেখা দিতে পারে।
২. অটোইমিউন রোগ: লুপাস বা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো রোগে শরীরের ইমিউন সিস্টেম নিজের টিস্যুকে আক্রমণ করলে এই প্রদাহ হয়।
৩. হার্ট অ্যাটাক পরবর্তী অবস্থা: হার্ট অ্যাটাকের কয়েক সপ্তাহ পর ‘ড্রেসলার সিনড্রোম’ হিসেবে এটি দেখা দিতে পারে।
৪. কিডনি বিকল বা ক্যান্সার: দীর্ঘস্থায়ী কিডনি সমস্যা বা শরীরের অন্য অংশের ক্যান্সার হৃদপিণ্ডের আবরণে ছড়িয়ে পড়লে এমন হতে পারে।
‘পেরিকার্ডিয়াল রাব’ ও আধুনিক রোগ নির্ণয়
চিকিৎসকরা স্টেথোস্কোপ দিয়ে যখন রোগীর বুক পরীক্ষা করেন, তখন এক ধরনের ঘর্ষণের শব্দ পান যাকে ‘পেরিকার্ডিয়াল রাব’ (Pericardial Rub) বলা হয়। এটি চামড়ার ওপর চামড়া ঘষলে যেমন শব্দ হয় অনেকটা তেমন। আধুনিক ডায়াগনস্টিক ব্যবস্থায় এখন ‘কার্ডিয়াক এমআরআই’ (Cardiac MRI) ব্যবহার করা হচ্ছে, যা হৃদপিণ্ডের আবরণের প্রদাহের মাত্রা এবং সেখানে তরল জমেছে কিনা (Pericardial Effusion) তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বলে দিতে পারে।
পেরিকার্ডাইটিস এর চিকিৎসা পদ্ধতি
চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো প্রদাহ কমানো এবং ব্যথা উপশম করা।
-
ওষুধ: সাধারণত এনএসআইডি (NSAIDs) বা প্রদাহনাশক ওষুধ যেমন আইবুপ্রোফেন দেওয়া হয়। এর সাথে ‘কলচিসিন’ (Colchicine) নামক একটি ওষুধ ব্যবহারের ফলে পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে।
-
বিশ্রাম: দ্রুত সেরে ওঠার জন্য শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
-
পদ্ধতিগত চিকিৎসা: যদি হৃদপিণ্ডের আবরণে প্রচুর পানি বা রক্ত জমে যায় (কার্ডিয়াক ট্যাম্পোনেড), তবে সুঁই দিয়ে সেই তরল বের করে দেওয়া হয়, যাকে বলা হয় ‘পেরিকার্ডিওসেন্টেসিস’।
সতর্কতা:
বুক ব্যথা মানেই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, তবে একে অবহেলা করাও বিপজ্জনক। যদি আপনার শুয়ে থাকলে বুক ব্যথা বাড়ে এবং বসে থাকলে কমে, তবে তা পেরিকার্ডাইটিসের স্পষ্ট সংকেত। সময়মতো সঠিক চিকিৎসায় এই রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব।
