x
d o c t o r s 2 4
09 Aug

ক্যান্সার হলো এমন একটি রোগ যেখানে শরীরের কোষগুলো অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বিভাজিত হয়, যা সুস্থ কোষ ও টিস্যুগুলোর ক্ষতি করে। এটি শরীরের যেকোনো অংশে শুরু হতে পারে এবং রক্ত বা লিম্ফ সিস্টেমের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশে ক্যান্সার মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ, এবং ২০২৪ সালের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ১.৫ লাখ মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। তবে, প্রাথমিক সনাক্তকরণ ও আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াই সম্ভব।

ক্যান্সারের বিভিন্ন ধরন রয়েছে, যার মধ্যে বাংলাদেশে প্রচলিত কয়েকটি হলো:

  1. ফুসফুসের ক্যান্সার: ধূমপান এবং বায়ু দূষণের কারণে বাংলাদেশে এটি একটি প্রধান সমস্যা। পুরুষদের মধ্যে এটি সবচেয়ে সাধারণ।
  2. স্তন ক্যান্সার: নারীদের মধ্যে এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১৫,০০০ নারী এতে আক্রান্ত হন।
  3. মুখ ও গলার ক্যান্সার: পান, জর্দা, এবং তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার এই ক্যান্সারের প্রধান কারণ। বাংলাদেশে এটি অত্যন্ত প্রচলিত।
  4. লিভার ক্যান্সার: হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস এবং অ্যালকোহল এর ঝুঁকি বাড়ায়।
  5. জরায়ুমুখের ক্যান্সার: এইচপিভি (হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস) এর সংক্রমণ এর প্রধান কারণ। বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে এটি দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রচলিত ক্যান্সার।
  6. লিম্ফোমা ও লিউকেমিয়া: রক্ত ও লিম্ফ সিস্টেমের ক্যান্সার, যা শিশু ও তরুণদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

ক্যান্সারের ঝুঁকির কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • তামাক ব্যবহার: ধূমপান, পান, বা জর্দা ফুসফুস ও মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। বাংলাদেশে প্রায় ৪০% পুরুষ তামাক ব্যবহার করেন।
  • সংক্রমণ: এইচপিভি, হেপাটাইটিস বি ও সি, এবং হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
  • অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত লাল মাংস, এবং কম ফাইবারযুক্ত খাবার কোলন ও পাকস্থলীর ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
  • শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও স্থূলতা: অতিরিক্ত ওজন স্তন ও জরায়ু ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
  • পরিবেশগত কারণ: বায়ু দূষণ, কীটনাশক, এবং অ্যাসবেস্টসের সংস্পর্শ ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে।
  • জেনেটিক প্রভাব: পরিবারে ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বাড়ে।

প্রাথমিক সনাক্তকরণ ক্যান্সারের চিকিৎসায় সাফল্যের হার বাড়ায়। বাংলাদেশে সচেতনতার অভাবে অনেক ক্ষেত্রে ক্যান্সার দেরিতে ধরা পড়ে। প্রাথমিক সনাক্তকরণের কিছু উপায়:

  • স্তন ক্যান্সার: নিয়মিত স্ব-পরীক্ষা এবং ৪০ বছরের পর ম্যামোগ্রাফি।
  • জরায়ুমুখের ক্যান্সার: ৩০ বছরের পর নিয়মিত প্যাপ স্মিয়ার বা এইচপিভি টেস্ট।
  • ফুসফুসের ক্যান্সার: ধূমপানকারীদের জন্য বছরে একবার লো-ডোজ সিটি স্ক্যান।
  • লিভার ক্যান্সার: হেপাটাইটিস রোগীদের নিয়মিত আল্ট্রাসাউন্ড ও আলফা-ফিটোপ্রোটিন (AFP) টেস্ট।
  • মুখের ক্যান্সার: দাঁতের ডাক্তার বা ইএনটি বিশেষজ্ঞের নিয়মিত পরীক্ষা।
  • সাধারণ লক্ষণ: অব্যাখ্যাত ওজন হ্রাস, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, কাশি, বা শরীরে অস্বাভাবিক গোটা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে সাশ্রয়ী মূল্যে স্ক্রিনিং সুবিধা বাড়ছে। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্চ অ্যান্ড হসপিটাল (NICRH) প্রাথমিক সনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

ক্যান্সারের চিকিৎসা গত দশকে ব্যাপক উন্নতি লাভ করেছে। বাংলাদেশেও আধুনিক চিকিৎসা ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে। প্রধান চিকিৎসা পদ্ধতি ও নতুন অগ্রগতি:

১. ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা

  • সার্জারি: টিউমার অপসারণের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসা। বাংলাদেশে রোবোটিক সার্জারি এখন কিছু হাসপাতালে শুরু হয়েছে।
  • রেডিয়েশন থেরাপি: উচ্চ-শক্তির রশ্মি ব্যবহার করে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস। লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটরের মতো আধুনিক যন্ত্র বাংলাদেশে পাওয়া যায়।
  • কেমোথেরাপি: ক্যান্সার কোষ ধ্বংসের জন্য ওষুধ। এটি এখনো বহুল ব্যবহৃত হলেও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশি।

২. আধুনিক চিকিৎসা

  • ইমিউনোথেরাপি: শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে লড়াই করায়। চেকপয়েন্ট ইনহিবিটর (যেমন নিভোলুমাব) ফুসফুস ও ত্বকের ক্যান্সারে কার্যকর।
  • টার্গেটেড থেরাপি: নির্দিষ্ট ক্যান্সার কোষের জিন বা প্রোটিন লক্ষ্য করে ওষুধ প্রয়োগ। উদাহরণস্বরূপ, স্তন ক্যান্সারের জন্য হারসেপটিন।
  • জিন থেরাপি: ক্যান্সার কোষের জিনগত ত্রুটি সংশোধনের জন্য গবেষণা চলছে। ২০২৫ সালে এই থেরাপি বাংলাদেশে সীমিতভাবে পাওয়া যেতে পারে।
  • CAR-T সেল থেরাপি: রক্তের ক্যান্সারের জন্য এই থেরাপি রোগীর টি-সেল পুনর্বিন্যাস করে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করে। এটি এখনো বাংলাদেশে পাওয়া যায় না, তবে ভারতের কিছু হাসপাতালে এটি শুরু হয়েছে।
  • প্রিসিশন মেডিসিন: রোগীর জিনগত গঠনের উপর ভিত্তি করে ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা। এটি ক্যান্সার চিকিৎসায় বিপ্লব ঘটাচ্ছে।

৩. নতুন গবেষণা

  • লিকুইড বায়োপসি: রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যান্সারের প্রাথমিক সনাক্তকরণ। এটি বাংলাদেশে এখনো বাণিজ্যিকভাবে পাওয়া যায় না, তবে গবেষণা চলছে।
  • ক্যান্সার ভ্যাকসিন: এইচপিভি ভ্যাকসিন জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে কার্যকর। বাংলাদেশে সরকার এই ভ্যাকসিন কিশোরীদের জন্য বিনামূল্যে প্রদান শুরু করেছে।
  • ন্যানোটেকনোলজি: ন্যানো-কণার মাধ্যমে ওষুধ সরাসরি ক্যান্সার কোষে পৌঁছানোর গবেষণা চলছে।

 

Leave A Comment