x
d o c t o r s 2 4
26 Jan

ক্যান্সার এবং অটোইমিউন রোগের মতো প্রাণঘাতী ব্যাধির চিকিৎসায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে ‘সেল থেরাপি’ বা কোষ-ভিত্তিক থেরাপি। কৃত্রিম ওষুধের বদলে রোগীর শরীরের নিজস্ব কোষকে ল্যাবরেটরিতে পুনর্গঠিত করে পুনরায় শরীরে প্রবেশ করানোর এই পদ্ধতিটি এখন বিশ্বজুড়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

দশক ধরে ক্যান্সার মানেই ছিল কেমোথেরাপি কিংবা রেডিয়েশনের মতো যন্ত্রণাদায়ক পদ্ধতি, যা সুস্থ কোষকেও ধ্বংস করে ফেলে। কিন্তু কোষ-ভিত্তিক থেরাপি, বিশেষ করে ‘কার-টি সেল’ (CAR-T cell) থেরাপি এই চিরাচরিত ধারণা বদলে দিয়েছে। এই পদ্ধতিতে রোগীর রক্ত থেকে টি-লিফোসাইট বা টি-কোষ সংগ্রহ করা হয়। ল্যাবরেটরিতে এই কোষগুলোকে জিনগতভাবে এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে তারা নির্দিষ্ট ক্যান্সার কোষকে চিনতে পারে এবং সেগুলোকে নির্ভুলভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। এটি অনেকটা শরীরের নিজস্ব বাহিনীকে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে শত্রুর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার মতো।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই থেরাপি কেবল ক্যান্সারের জন্য নয়, বরং অটোইমিউন রোগের ক্ষেত্রেও এক নতুন আশার আলো। লুপাস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস কিংবা মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের মতো রোগে শরীরের ইমিউন সিস্টেম যখন নিজের সুস্থ কোষকে আক্রমণ করে, তখন কোষ-ভিত্তিক থেরাপির মাধ্যমে সেই বিশৃঙ্খল কোষগুলোকে নিয়ন্ত্রণ বা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে রোগী দীর্ঘমেয়াদী ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছেন।

কোষ-ভিত্তিক থেরাপির উল্লেখযোগ্য কিছু দিক:

বর্তমানে এই প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে। এর প্রধান কিছু প্রভাব নিচে তুলে ধরা হলো:

  • নির্ভুল লক্ষ্যভেদ: প্রচলিত কেমোথেরাপির মতো এটি পুরো শরীরকে বিষাক্ত করে না, বরং শুধুমাত্র ক্ষতিকর কোষকে আক্রমণ করে।

  • দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা: এই থেরাপিতে ব্যবহৃত কোষগুলো শরীরে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে এবং ভবিষ্যতে ক্যান্সার ফিরে আসার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।

  • জটিল রোগের সমাধান: লিপিড ক্যান্সার বা লিউকেমিয়ার মতো কঠিন রোগে এই থেরাপি বিস্ময়কর সাফল্য দেখিয়েছে।

  • অটোইমিউন নিয়ন্ত্রণ: শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ‘ভুল’ শুধরে দিয়ে অটোইমিউন রোগের স্থায়ী সমাধান দিচ্ছে এই আধুনিক বিজ্ঞান।

তবে এই থেরাপি এখনো বেশ ব্যয়বহুল এবং প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত উন্নত ল্যাবরেটরি প্রয়োজন। বাংলাদেশে এই ধরনের চিকিৎসার প্রচলন এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও, দেশীয় বায়োটেকনোলজি প্রতিষ্ঠানগুলো এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (BSMMU)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই বিষয়ে গবেষণার আগ্রহ দেখাচ্ছে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই ধারাকে অনেকে ‘লিভিং ড্রাগ’ বা জীবন্ত ওষুধ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। কারণ এটি কোনো রাসায়নিক যৌগ নয়, বরং একটি জীবিত জৈবিক সত্তা যা প্রতিনিয়ত শরীরের ভেতরে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।

কোষ-ভিত্তিক থেরাপি কেবল একটি নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রোগমুক্ত জীবনের অঙ্গীকার। ক্যান্সার বা অটোইমিউন রোগের মতো জটিল ব্যাধি এখন আর কেবল ‘ব্যবস্থাপনাযোগ্য’ নয়, বরং ‘নিরাময়যোগ্য’ হওয়ার পথে। যদিও সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে এই চিকিৎসা পৌঁছাতে আরও কিছুটা সময় এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন, তবুও বিজ্ঞানের এই জয়যাত্রা মানবজাতির জন্য এক নতুন সূর্যোদয়। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো ওষুধের দোকানের বড় বড় ট্যাবলেটের বদলে শরীরের নিজস্ব কোষই হবে সব রোগের মহৌষধ।

Leave A Comment