ইমিউন সিস্টেমের বিরল ও বংশগত রোগগুলোর মধ্যে এক্স-লিঙ্কড অ্যাগামাগ্লোবুলিনেমিয়া (XLA) বা ‘ব্রুটনস ডিজিজ’ অত্যন্ত জটিল। সাধারণত এই রোগটি শিশুদের (মূলত ছেলেদের) ক্ষেত্রে ৬ থেকে ৯ মাস বয়সের পর থেকে ধরা পড়তে শুরু করে। তবে অনেক ক্ষেত্রে রোগটি পূর্ণরূপে শনাক্ত হওয়ার প্রায় ২ বছর আগে থেকেই শরীর এমন কিছু সংকেত দেয়, যা সাধারণ সর্দি-কাশি মনে করে অবহেলা করা হয়।
এই নিবন্ধে আমরা XLA-এর এমন ৬টি প্রাথমিক লক্ষণ নিয়ে আলোচনা করব, যা দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা এড়াতে সাহায্য করবে।
১. টনসিল ও লিম্ফ নোডের অস্বাভাবিক ক্ষুদ্রতা
XLA আক্রান্ত শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি করা বি-কোষ (B-cells) থাকে না। যেহেতু টনসিল এবং ঘাড়ের লিম্ফ নোডগুলো মূলত বি-কোষ দিয়ে গঠিত, তাই এই শিশুদের টনসিল এবং লিম্ফ নোড অস্বাভাবিকভাবে ছোট থাকে বা একেবারেই থাকে না। চিকিৎসকের কাছে চেকআপের সময় এটিই হতে পারে প্রথম ক্লিনিক্যাল সংকেত।
২. বারবার কানের সংক্রমণ (Chronic Otitis Media)
রোগটি শনাক্ত হওয়ার আগে প্রায় ১ থেকে ২ বছর ধরে শিশু বারবার কানের সংক্রমণে ভুগতে পারে। সাধারণ শিশুদের চেয়ে এদের সংক্রমণের হার অনেক বেশি এবং এটি বারবার ফিরে আসে। কানের ব্যথা, পুঁজ পড়া বা শ্রবণশক্তির সামান্য সমস্যাও এর আগাম সংকেত হতে পারে।
৩. দীর্ঘস্থায়ী নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কাইটিস
XLA শনাক্তের অনেক আগে থেকেই ফুসফুসে ব্যাকটেরিয়ার হানা শুরু হয়। বারবার নিউমোনিয়া বা তীব্র ব্রঙ্কাইটিস হওয়া মানে হলো শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়ছে। এই সংক্রমণগুলো সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকে দ্রুত সারতে চায় না এবং বারবার হসপিটালাইজেশনের প্রয়োজন পড়ে।
৪. বৃদ্ধি ও ওজনে স্থবিরতা (Failure to Thrive)
শিশুর বয়স অনুযায়ী ওজন ও উচ্চতা না বাড়া এই রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক লক্ষণ। যেহেতু শরীরের পুরো শক্তি সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ব্যয় হয়, তাই শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। ২ বছর ধরে যদি দেখা যায় শিশু পুষ্টিকর খাবার সত্ত্বেও বাড়ছে না, তবে ইমিউন টেস্ট করানো জরুরি।
৫. দীর্ঘমেয়াদী জিয়ার্ডিয়া ও ডায়রিয়া
আমাদের অন্ত্রের সুরক্ষার জন্য বিশেষ ধরণের অ্যান্টিবডি (IgA) প্রয়োজন। XLA আক্রান্ত শিশুদের শরীরে এর অভাব থাকায় তারা সহজেই ‘জিয়ার্ডিয়া’ নামক পরজীবী দ্বারা আক্রান্ত হয়। ফলে শনাক্ত হওয়ার অনেক আগে থেকেই শিশুর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া বা হজমের সমস্যা দেখা দেয়।
৬. জয়েন্টে ব্যথা বা বাতের মতো উপসর্গ (Arthritis-like Symptoms)
অনেক সময় এই রোগটি শনাক্ত হওয়ার আগে শিশুদের হাঁটু বা অন্যান্য জয়েন্টে ব্যথা ও ফোলা ভাব দেখা দিতে পারে। একে অনেক সময় ভুলবশত ‘জুভেনাইল রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস’ মনে করা হয়। আসলে এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ভারসাম্যহীনতার একটি বহিঃপ্রকাশ।
মায়েদের প্রতি বিশেষ সতর্কতা
জন্মের পর প্রথম ৬ মাস পর্যন্ত শিশু মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকে। তাই এই রোগের লক্ষণগুলো ৬ মাসের পর থেকেই স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। যদি আপনার পরিবারের কোনো ছেলে শিশুর মধ্যে ওপরের লক্ষণগুলো ২ বছরের বেশি সময় ধরে নিয়মিত দেখা যায়, তবে দেরি না করে একজন পেডিয়াট্রিক ইমিউনোলজিস্টের পরামর্শ নিন।
XLA শনাক্তে করণীয়:
-
রক্তে ইমিউনোগ্লোবুলিন (IgG, IgA, IgM) মাত্রা পরীক্ষা করা।
-
বি-লিম্ফোসাইট বা সিডি১৯+ (CD19+) কোষের সংখ্যা পরীক্ষা।
-
BTK জিন মিউটেশন পরীক্ষা করা।
সঠিক সময়ে ইমিউনোগ্লোবুলিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি শুরু করলে আক্রান্ত শিশুও সাধারণ মানুষের মতো দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন পেতে পারে।
