x
d o c t o r s 2 4
19 Jul

জরায়ুমুখের ক্যান্সার বিশ্বব্যাপী মহিলাদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। এই মারাত্মক রোগটি হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি) দ্বারা সৃষ্ট, এবং এটি প্রতিরোধে এইচপিভি ভ্যাকসিন সবচেয়ে কার্যকর। তবে, এই ভ্যাকসিন নিয়ে অনেক মিথ এবং ভুল ধারণা রয়েছে, যা সচেতনতার অভাবে মহিলাদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছে। জানুয়ারি মাসকে জরায়ুমুখের ক্যান্সার সচেতনতা মাস হিসেবে পালন করা হয়, যাতে এই রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া যায়। এই নিবন্ধে আমরা এইচপিভি ভ্যাকসিন সম্পর্কিত কিছু সাধারণ মিথ ও তার সত্যতা নিয়ে আলোচনা করব।

জরায়ুমুখের ক্যান্সার কী?

জরায়ুমুখের ক্যান্সার হলো জরায়ুর নিম্নাংশে (সার্ভিক্স) ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি। এটি প্রধানত এইচপিভি ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে হয়, যা যৌন সংসর্গের মাধ্যমে ছড়ায়। এই রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ না দেখালেও, উন্নত পর্যায়ে অনিয়মিত রক্তপাত, পেলভিক ব্যথা, এবং অস্বাভাবিক যোনিস্রাবের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে এটি মারাত্মক হতে পারে।

এইচপিভি ভ্যাকসিন কেন গুরুত্বপূর্ণ?

এইচপিভি ভ্যাকসিন জরায়ুমুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি ৯০% পর্যন্ত কমাতে পারে। এটি এইচপিভি ভাইরাসের সবচেয়ে ক্ষতিকর স্ট্রেনগুলোর বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়, যা কেবল জরায়ুমুখের ক্যান্সার নয়, মুখ, গলা, এবং মলদ্বারের ক্যান্সারের ঝুঁকিও কমায়। এই ভ্যাকসিন ১১-১২ বছর বয়সে দেওয়া সবচেয়ে কার্যকর, তবে প্রাপ্তবয়স্করাও এটি নিতে পারেন।

এইচপিভি ভ্যাকসিন সম্পর্কিত মিথ ও সত্য

নিচে এইচপিভি ভ্যাকসিন নিয়ে কিছু সাধারণ মিথ এবং তাদের সত্যতা উল্লেখ করা হলো:

  • মিথ ১: ১২ বছর বয়সের পর এইচপিভি ভ্যাকসিন নেওয়া যায় না।
    সত্য: এইচপিভি ভ্যাকসিন বয়ঃসন্ধিকালের পরেও নেওয়া যায়, এমনকি যৌনভাবে সক্রিয় ব্যক্তিরাও এটি নিতে পারেন। তবে, যৌন সংসর্গের আগে নেওয়া হলে এটি বেশি কার্যকর। ৪৫ বছর পর্যন্ত এই ভ্যাকসিন দেওয়া যেতে পারে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
  • মিথ ২: ইতিমধ্যে এইচপিভি সংক্রমিত হলে ভ্যাকসিন নেওয়া যায় না।
    সত্য: এইচপিভি ভাইরাসের ১০০টিরও বেশি স্ট্রেন রয়েছে। আপনি যদি একটি স্ট্রেনে সংক্রমিত হয়ে থাকেন, তবুও ভ্যাকসিন অন্যান্য ক্ষতিকর স্ট্রেনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে পারে। বর্তমানে গার্ডাসিল-৯ ভ্যাকসিন ৯টি বিপজ্জনক স্ট্রেনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়।
  • মিথ ৩: এইচপিভি ভ্যাকসিন শুধু মেয়েদের জন্য।
    সত্য: এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। এইচপিভি পুরুষ এবং মহিলা উভয়কেই সংক্রমিত করতে পারে এবং ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। পুরুষদের ক্ষেত্রে এটি পেনাইল, মলদ্বার, বা গলার ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। তাই উভয় লিঙ্গের জন্যই এই ভ্যাকসিন গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
  • মিথ ৪: এইচপিভি ভ্যাকসিন বন্ধ্যাত্ব ঘটায়।
    সত্য: এইচপিভি ভ্যাকসিন বন্ধ্যাত্বের কারণ হয় না। এটির সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে ইনজেকশন স্থানে ব্যথা, জ্বর, মাথাব্যথা, বা ক্লান্তি। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে এই ভ্যাকসিন প্রজনন ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।
  • মিথ ৫: নিয়মিত প্যাপ স্মিয়ার করলে ভ্যাকসিনের প্রয়োজন নেই।
    সত্য: প্যাপ স্মিয়ার এবং এইচপিভি ভ্যাকসিন ভিন্ন উদ্দেশ্যে কাজ করে। প্যাপ স্মিয়ার অস্বাভাবিক কোষ শনাক্ত করে, যা ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। অন্যদিকে, ভ্যাকসিন এইচপিভি সংক্রমণ প্রতিরোধ করে, যা ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। উভয়ই জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ।
  • মিথ ৬: এইচপিভি ভ্যাকসিন দীর্ঘস্থায়ী নয়।
    সত্য: গবেষণায় দেখা গেছে, এইচপিভি ভ্যাকসিন দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দেয়। ২-৩ ডোজের পর বুস্টার ডোজের প্রয়োজন হয় না। তবে, দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা চলমান।

জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে অতিরিক্ত পরামর্শ

  • নিয়মিত স্ক্রিনিং: ২১-৬৫ বছর বয়সী মহিলাদের প্রতি ৩-৫ বছরে প্যাপ স্মিয়ার বা এইচপিভি টেস্ট করানো উচিত।
  • নিরাপদ যৌন জীবন: কনডম ব্যবহার এইচপিভি সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে পারে, তবে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দেয় না।
  • ধূমপান ত্যাগ: ধূমপান জরায়ুমুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
  • পুষ্টিকর খাদ্য: ভিটামিন সি, ই, এবং ফলিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার (যেমন কমলা, পালং শাক, ব্রকলি) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
  • ভ্যাকসিন গ্রহণ: ১১-১২ বছর বয়সে এইচপিভি ভ্যাকসিন নেওয়া আদর্শ। প্রাপ্তবয়স্করা চিকিৎসকের পরামর্শে এটি নিতে পারেন।

 

Leave A Comment