x
d o c t o r s 2 4
জেনে নিন হিস্ট্রিওনিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার ও তার প্রতিকার
17 Feb

একজন মানুষ ভিড়ের মধ্যে সবসময় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হতে চাইছেন, অতিরঞ্জিত অঙ্গভঙ্গি করছেন কিংবা খুব দ্রুত আবেগ পরিবর্তন করছেন—একে আমরা অনেক সময় ‘নাটকীয়তা’ বলে এড়িয়ে যাই। কিন্তু মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি জটিল মানসিক অবস্থা, যার নাম হিস্ট্রিওনিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (HPD)।

এটি মূলত ‘ক্লাস্টার বি’ ঘরানার ব্যক্তিত্বের ব্যাধি, যা একজন ব্যক্তির চিন্তা ও আচরণের ধরণকে অস্বাভাবিকভাবে প্রভাবিত করে।

হিস্ট্রিওনিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার কী?

সহজ কথায়, এটি এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে ব্যক্তি অন্যের মনোযোগ পাওয়ার জন্য প্রচণ্ড ব্যাকুল থাকেন। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিরা যখন স্পটলাইটে না থাকেন, তখন তারা নিজেদের মূল্যহীন মনে করতে শুরু করেন। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২ শতাংশ মানুষ এই সমস্যায় ভুগছেন, যার লক্ষণগুলো সাধারণত কৈশোরের শেষের দিকে বা ২০ বছরের শুরুর দিকে প্রকাশ পায়।

লক্ষণ যা দেখে সতর্ক হবেন

হিস্ট্রিওনিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারের লক্ষণগুলো কেবল সাধারণ মনোযোগ আকর্ষণ নয়, বরং তার চেয়েও গভীর। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

  • অত্যধিক নাটকীয়তা: ছোট কোনো বিষয়কে বিশাল করে উপস্থাপন করা এবং তীব্র আবেগ প্রকাশ করা।

  • উত্তেজক আচরণ: অনর্থক ফ্লার্টিং বা যৌন আবেদনময়ী পোশাক পরে অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করা, যা অনেক সময় কাজের পরিবেশ বা সামাজিক পরিস্থিতির সাথে বেমানান।

  • দ্রুত আবেগ পরিবর্তন: এক মুহূর্তেই খুব খুশি, আবার পরক্ষণেই অত্যন্ত বিষণ্ণ হয়ে যাওয়া। এই আবেগগুলো গভীর নয়, বরং অনেক সময় লোকদেখানো মনে হয়।

  • ভাসা ভাসা কথা বলা: তারা কথা বলেন খুব জোরালোভাবে, কিন্তু তাদের বক্তব্যে পর্যাপ্ত তথ্য বা যুক্তির অভাব থাকে।

  • সম্পর্ক নিয়ে ভুল ধারণা: কোনো সাধারণ পরিচিত মানুষকেও তারা নিজেদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা আপনজন ভেবে বসেন।

কেন হয় এই ডিসঅর্ডার?

গবেষকদের মতে, এর পেছনে সুনির্দিষ্ট একটি কারণ নেই, বরং জেনেটিক এবং পরিবেশগত কারণের সমন্বয় কাজ করে:

  • জেনেটিক্স: পরিবারে কারও এই সমস্যা থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

  • শৈশবের পরিবেশ: বাবা-মায়ের অতিরিক্ত আসকারা দেওয়া, আবার কখনো অনিয়মিত শাসন শিশুর মধ্যে এমন আচরণ গড়ে তুলতে পারে। অনেক শিশু পর্যাপ্ত মনোযোগ না পেয়ে বড় হলে নিজেকে জাহির করার এই প্রবণতা রপ্ত করে।

আধুনিক চিকিৎসা ও থেরাপি

HPD-এর চিকিৎসা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং, কারণ আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় মনে করেন না যে তাদের কোনো সমস্যা আছে। তবে সঠিক থেরাপির মাধ্যমে সুস্থ জীবন সম্ভব।

  • সাইকোডাইনামিক থেরাপি: এটি সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। এখানে ব্যক্তির ভেতরের অবদমিত আবেগ এবং শৈশবের কোনো ট্রমা খুঁজে বের করে তার আচরণের মূল কারণ উদঘাটন করা হয়।

  • কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (CBT): এর মাধ্যমে রোগীকে শেখানো হয় কীভাবে তার অতিরঞ্জিত চিন্তাভাবনা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং কীভাবে মানুষের সাথে সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

  • গ্রুপ থেরাপি: এটি রোগীকে আয়নার মতো নিজের আচরণ দেখতে সাহায্য করে। অন্য রোগীদের আচরণ দেখে তারা বুঝতে পারেন যে তাদের নিজস্ব আচরণ অন্যদের কাছে কেমন দেখায়।

  • ওষুধের ব্যবহার: সরাসরি এই ডিসঅর্ডারের কোনো ওষুধ নেই, তবে এর সাথে যুক্ত ডিপ্রেশন বা উদ্বেগের জন্য চিকিৎসকরা মাঝে মাঝে অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট বা অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি ওষুধ দেন।

নতুন তথ্য ও সামাজিক প্রভাব

২০২৬ সালের সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে, সোশ্যাল মিডিয়ার বর্তমান যুগে হিস্ট্রিওনিক বৈশিষ্ট্যের মানুষরা ‘লাইক’ বা ‘কমেন্ট’-এর ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন, যা তাদের মানসিক অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই কেবল চিকিৎসা নয়, ডিজিটাল ডিটক্স এবং সুস্থ পারিবারিক পরিবেশ এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে বড় ভূমিকা রাখে।

আপনার আশেপাশে কি এমন কেউ আছেন যার মধ্যে এই লক্ষণগুলো প্রকট? মনে রাখবেন, এটি কোনো স্বভাব নয়, বরং একটি চিকিৎসাযোগ্য মানসিক অবস্থা। সহমর্মিতার সাথে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই হবে বুদ্ধিমত্তার কাজ।

Leave A Comment