x
d o c t o r s 2 4
25 Jan

ত্বকের রহস্যময় র‍্যাশ আর শরীরের পেশি অবসন্ন হয়ে আসা—এই দুইয়ের মেলবন্ধনে সৃষ্ট এক বিরল ব্যাধি ‘ডার্মাটোমায়োসাইটিস’। চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলছেন, এই রোগটি পূর্ণ শক্তিতে শরীরকে আক্রমণ করার অন্তত দুই মাস বা ৬০ দিন আগে থেকে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট লক্ষণ জানান দিতে শুরু করে। সময়মতো এই সংকেত বুঝতে পারাটাই পঙ্গুত্ব থেকে বাঁচার একমাত্র পথ।

ডার্মাটোমায়োসাইটিস (Dermatomyositis) মূলত একটি প্রদাহজনিত অটো-ইমিউন রোগ। এটি কেবল ত্বকের সৌন্দর্যই নষ্ট করে না, বরং শরীরের অভ্যন্তরীণ পেশিকলাগুলোকে তিলে তিলে ধ্বংস করে দেয়। আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যখন নিজের শরীরের সুস্থ টিস্যুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, তখনই এই সংকটের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে চর্মরোগ বা বাতের ব্যথাকে অনেকেই সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা করেন, যা ডার্মাটোমায়োসাইটিসের রোগীদের জন্য চরম ঝুঁকি বয়ে আনে।

বিশেষজ্ঞ রিউমাটোলজিস্টদের মতে, এই রোগের আক্রমণ হঠাৎ করে হয় না। এটি শরীরে ডালপালা মেলার অন্তত দুই মাস আগে থেকেই কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজের উপস্থিতি জানান দেয়।

২ মাস আগে থেকে প্রকট হওয়া ৫টি প্রধান লক্ষণ

রোগ নির্ণয়ের অন্তত আট সপ্তাহ আগে থেকেই আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে নিচের পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করা যায়:

  • চোখের পাতায় বেগুনি আভার র‍্যাশ (Heliotrope Rash): এটি এই রোগের সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষণ। কোনো অ্যালার্জি ছাড়াই যদি চোখের উপরের পাতায় হালকা বেগুনি বা লালচে রঙের ছোপ দেখা দেয় এবং সেখানে সামান্য ফোলাভাব থাকে, তবে তা বড় বিপদের পূর্বাভাস। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘হেলিওট্রোপ র‍্যাশ’ বলা হয়।

  • আঙুলের গিঁটে খসখসে লাল দাগ (Gottron Papules): হাতের আঙুলের গিঁট, কনুই বা হাঁটুর চামড়া হঠাৎ করেই খসখসে হয়ে লালচে বা বেগুনি রঙ ধারণ করতে পারে। সাধারণ চর্মরোগ মনে হলেও এগুলো আসলে রক্তনালীর প্রদাহের আগাম সংকেত।

  • ভারী জিনিস তুলতে বা বাহু প্রসারিত করতে অনীহা: দুই মাস আগে থেকেই রোগী অনুভব করেন যে, হাত তুলে চুল আঁচড়ানো বা ওপরের তাক থেকে কোনো জিনিস নামানো আগের চেয়ে অনেক বেশি কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। এটি কাঁধের পেশিতে প্রদাহ শুরু হওয়ার লক্ষণ।

  • নখের চারপাশের চামড়ায় পরিবর্তন: নখের গোড়ার চামড়া বা ‘কিউটিকল’ অনেক সময় লাল হয়ে ফুলে ওঠে এবং নখের আশপাশে খুব ছোট ছোট রক্তনালী স্পষ্ট দেখা যায়। এটি শরীরের ভেতরে রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হওয়ার একটি প্রাথমিক ধাপ।

  • অস্বাভাবিক সূর্যসংবেদনশীলতা (Photosensitivity): রোদে গেলে যদি বুকের উপরের অংশে (V-neck এলাকা) বা পিঠের উপরিভাগে তীব্র লালচে র‍্যাশ দেখা দেয় যা সহজে কমে না, তবে বুঝতে হবে তা ডার্মাটোমায়োসাইটিসের সংকেত দিচ্ছে।

রোগ ও ঝুঁকি সম্পর্কে কিছু জরুরি তথ্য

ডার্মাটোমায়োসাইটিস কেবল একটি একক রোগ নয়, এটি শরীরের সামগ্রিক কার্যকারিতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়:

  • জটিলতা: এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ইন্টারস্টিশিয়াল লাং ডিজিজ (ILD) এবং হৃদপিণ্ডের পেশিতে প্রদাহের ঝুঁকি থাকে।

  • বয়সসীমা: এটি মূলত দুই ধরণের হয়— ৫ থেকে ১৫ বছরের শিশুদের মধ্যে ‘জুভেনাইল’ এবং ৪০ থেকে ৬০ বছরের বড়দের মধ্যে ‘অ্যাডাল্ট’ ডার্মাটোমায়োসাইটিস।

  • ক্যান্সার সংযোগ: বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই রোগের সাথে শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো ম্যালিগন্যান্সি বা ক্যান্সারের যোগসূত্র থাকার সম্ভাবনা থাকে।

প্রতিকার ও জনসচেতনতা

ডার্মাটোমায়োসাইটিসের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদী হলেও বর্তমানে আধুনিক ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধের মাধ্যমে একে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দুই মাস আগের এই লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব না দেওয়ায় অনেক রোগী যখন চিকিৎসকের কাছে আসেন, ততক্ষণে তাদের পেশি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো—ত্বকের কোনো বিচিত্র রঙের পরিবর্তনের সাথে যদি শারীরিক দুর্বলতা অনুভব করেন, তবে দেরি না করে দ্রুত ‘মাসল এনজাইম’ বা বায়োপসি পরীক্ষা করানো উচিত।

শরীরের চামড়া ও পেশি যখন একসাথে বিদ্রোহ করে, তখন তাকে অবহেলা করার কোনো অবকাশ নেই। ডার্মাটোমায়োসাইটিস একটি জীবনব্যাপী যুদ্ধ হতে পারে, কিন্তু দুই মাস আগে থেকে পাওয়া সংকেতগুলো যদি আমরা চিনে নিতে পারি, তবে অকাল মৃত্যু ও শারীরিক সক্ষমতা হারানো থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব।

Leave A Comment