হাত বা পায়ে পাঁচটির বেশি আঙুল—চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় পলিড্যাকটিলি (Polydactyly)। এটি একটি জন্মগত শারীরিক বৈশিষ্ট্য বা ত্রুটি, যেখানে শিশু অতিরিক্ত একটি বা একাধিক আঙুল নিয়ে জন্মায়। অনেক সময় এটি শুধু বাহ্যিক গঠনগত সমস্যা, আবার কখনো বড় কোনো জেনেটিক সিন্ড্রোমের অংশ হিসেবেও দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পলিড্যাকটিলি সাধারণত জন্মের পর চোখে পড়ে। তবে আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির কারণে গর্ভধারণের অন্তত এক বছর আগেই, অর্থাৎ গর্ভকালীন সময়ে কিছু স্পষ্ট সতর্ক সংকেত ধরা পড়ে, যা আগাম শনাক্তে সাহায্য করে। ফলে পরিবার ও চিকিৎসকেরা প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা নিতে পারেন।
নিচে তুলে ধরা হলো পলিড্যাকটিলির ৩টি গুরুত্বপূর্ণ আগাম লক্ষণ—
১. আল্ট্রাসাউন্ডে হাত-পায়ের অস্বাভাবিক গঠন ধরা পড়া
গর্ভের ১৪–২০ সপ্তাহের আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যানে শিশুর হাত বা পায়ে অতিরিক্ত ছোট আঙুলের ছায়া দেখা যেতে পারে। অনেক সময় আঙুল পুরোপুরি তৈরি না হলেও আলাদা হাড় বা টিস্যুর উপস্থিতি বোঝা যায়। এটি পলিড্যাকটিলির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও প্রথম সতর্ক সংকেত।
২. জেনেটিক পরীক্ষায় ক্রোমোজোম ত্রুটির ইঙ্গিত
কিছু ক্ষেত্রে পলিড্যাকটিলি একক সমস্যা হলেও, এটি ডাউন সিন্ড্রোম, বার্ডেট-বিডেল সিন্ড্রোম বা অন্যান্য জেনেটিক রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। NIPT, অ্যামনিওসেন্টেসিস বা CVS পরীক্ষায় ক্রোমোজোমের অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লে অতিরিক্ত আঙুলের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
৩. পরিবারে একই ধরনের ইতিহাস থাকা
পরিবারে বাবা-মা বা নিকট আত্মীয়ের কারও অতিরিক্ত আঙুল থাকলে সন্তানের মধ্যেও একই বৈশিষ্ট্য দেখা দিতে পারে। পলিড্যাকটিলি অনেক সময় বংশগতভাবে (Autosomal Dominant) ছড়ায়। তাই গর্ভধারণের আগেই জেনেটিক কাউন্সেলিং গুরুত্বপূর্ণ।
পলিড্যাকটিলি কতটা সাধারণ?
পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি ৫০০–১০০০ নবজাতকের মধ্যে একজনের এই বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। আফ্রিকান ও এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি গুরুতর নয় এবং অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সহজেই ঠিক করা যায়।
কখন চিন্তার কারণ?
যদি অতিরিক্ত আঙুলের সঙ্গে—
- হৃদযন্ত্রের সমস্যা
- কিডনি ত্রুটি
- বুদ্ধিবিকাশে বিলম্ব
- চোখ বা হরমোনজনিত সমস্যা
দেখা যায়, তাহলে বড় কোনো জেনেটিক সিন্ড্রোমের সম্ভাবনা থাকতে পারে। তখন বিশেষজ্ঞ পরীক্ষা জরুরি।
চিকিৎসা কী?
শিশুর জন্মের পর প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে অতিরিক্ত আঙুল অপসারণ করা যায়। সাধারণত ৬–১২ মাস বয়সের মধ্যে অপারেশন করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। ফিজিওথেরাপি ও ফলোআপ চিকিৎসাও দরকার হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
চিকিৎসকেরা বলছেন, “গর্ভকালীন নিয়মিত আল্ট্রাসাউন্ড ও স্ক্রিনিং পরীক্ষা অবহেলা করবেন না। ছোট্ট গঠনগত পরিবর্তনও আগাম বড় তথ্য দিতে পারে।”
পলিড্যাকটিলি অনেক সময় শুধুই একটি শারীরিক বৈশিষ্ট্য, তবে সচেতনতা থাকলে ভবিষ্যতের জটিলতা এড়ানো যায়। তাই মা ও শিশুর সুস্থতার জন্য গর্ভকালীন যত্ন ও আগাম পরীক্ষাই হতে পারে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
