মানবদেহের ‘মাস্টার গ্ল্যান্ড’ হিসেবে পরিচিত পিটুইটারি গ্রন্থি মস্তিষ্কের নিচে অবস্থিত ছোট্ট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। এই গ্রন্থি শরীরের প্রায় সব হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে—থাইরয়েড, অ্যাড্রিনাল, প্রজনন হরমোন থেকে শুরু করে বৃদ্ধি ও দুধ উৎপাদন পর্যন্ত। তাই এখানে টিউমার হলে পুরো শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, পিটুইটারি টিউমার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধীরে ধীরে বড় হয় এবং প্রথমদিকে স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। তবে সমস্যা গুরুতর হওয়ার অন্তত ৬ মাস আগেই শরীর কিছু সতর্ক সংকেত দিতে শুরু করে। এসব লক্ষণকে সাধারণ অসুস্থতা ভেবে এড়িয়ে গেলে পরে বড় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
নিচে তুলে ধরা হলো পিটুইটারি টিউমারের ৭টি আগাম লক্ষণ, যেগুলো অবহেলা করা উচিত নয়—
১. নিয়মিত মাথাব্যথা
ঘন ঘন বা দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা পিটুইটারি টিউমারের সাধারণ উপসর্গ। টিউমার বড় হলে মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টি করে, ফলে মাথার ভেতরে চাপ অনুভূত হয়।
২. চোখে ঝাপসা দেখা বা দৃষ্টি কমে যাওয়া
পিটুইটারি গ্রন্থি অপটিক নার্ভের খুব কাছে অবস্থিত। টিউমার বড় হলে চোখের স্নায়ুতে চাপ পড়ে, ফলে ঝাপসা দেখা, ডাবল ভিশন বা পাশের দৃষ্টি কমে যেতে পারে।
৩. মাসিক অনিয়ম বা বন্ধ্যাত্ব
নারীদের ক্ষেত্রে পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যাওয়া, দেরিতে আসা বা অতিরিক্ত রক্তপাত হতে পারে। পুরুষদের ক্ষেত্রে শুক্রাণু কমে যাওয়া বা যৌনক্ষমতা হ্রাস দেখা যায়। প্রোল্যাকটিন হরমোন বেড়ে গেলে এমন সমস্যা বেশি হয়।
৪. স্তন থেকে দুধের মতো স্রাব
গর্ভবতী না হওয়া সত্ত্বেও স্তন থেকে দুধ বা সাদা তরল বের হলে সেটি প্রোল্যাকটিনোমা নামক পিটুইটারি টিউমারের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
৫. হঠাৎ ওজন ও শারীরিক গঠনের পরিবর্তন
কিছু টিউমার অতিরিক্ত গ্রোথ হরমোন তৈরি করে, ফলে হাত-পা বা মুখের আকার বড় হয়ে যায় (Acromegaly)। আবার কর্টিসল বেড়ে গেলে অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি ও মুখ গোলাকার হতে পারে (Cushing’s syndrome)।
৬. অতিরিক্ত ক্লান্তি ও হরমোনজনিত দুর্বলতা
হরমোনের ঘাটতির কারণে সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগা, শক্তি কমে যাওয়া বা মনোযোগে সমস্যা দেখা দেয়। থাইরয়েড বা অ্যাড্রিনাল হরমোন কমে গেলে এমন হয়।
৭. মুড সুইং ও মানসিক পরিবর্তন
অকারণে উদ্বেগ, হতাশা, রাগ বা আচরণগত পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। হরমোনের ভারসাম্যহীনতা সরাসরি মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে।
কেন আগাম শনাক্তকরণ জরুরি?
নিউরো-এন্ডোক্রাইন বিশেষজ্ঞদের মতে—
- দ্রুত চিকিৎসা করলে টিউমার বড় হওয়া রোধ করা যায়
- অস্ত্রোপচার বা ওষুধে সহজেই নিয়ন্ত্রণ সম্ভব
- স্থায়ী দৃষ্টিশক্তি বা হরমোনজনিত ক্ষতি এড়ানো যায়
কীভাবে পরীক্ষা করবেন?
- এমআরআই বা সিটি স্ক্যান
- হরমোন প্রোফাইল টেস্ট
- চোখের দৃষ্টি পরীক্ষা
- রক্তের প্রোল্যাকটিন ও গ্রোথ হরমোন পরীক্ষা
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
পিটুইটারি টিউমার ভয়ের কিছু নয়—তবে অবহেলা করলে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং সময়মতো চিকিৎসাই পারে সুস্থ জীবনের নিশ্চয়তা দিতে।
