x
d o c t o r s 2 4
পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ: অবহেলিত পায়ের ব্যথা কি হৃদরোগের সংকেত?
25 Feb

পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ (PAD) কেবল পায়ের সমস্যা নয়, এটি সারা শরীরের রক্ত সংবহনতন্ত্রের একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। যখন হৃদপিণ্ড থেকে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে (বিশেষ করে পায়ে) রক্ত বহনকারী ধমনীগুলো সরু হয়ে যায় বা চর্বি জমে বন্ধ হয়ে যায়, তখন তাকে পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ বলা হয়।

দীর্ঘক্ষণ হাঁটার পর পায়ে টান লাগা বা বিশ্রাম নিলে ব্যথা কমে যাওয়াকে আমরা অনেকেই বয়সের দোষ বা সাধারণ পেশির ক্লান্তি ভেবে ভুল করি। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, এটি হতে পারে পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ (PAD)।

গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের পায়ে এই সমস্যা রয়েছে, তাদের হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি। বর্তমানে অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা এবং ডায়াবেটিসের প্রকোপ বাড়ায় এই রোগটি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে।

পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজের প্রধান লক্ষণসমূহ

PAD-এর লক্ষণগুলো খুব ধীরগতিতে প্রকাশ পায়, যা শনাক্ত করা জরুরি:

  • ইন্টারমিটেন্ট ক্লডিকেশন: হাঁটাচলা বা সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় পায়ের পেশিতে (বিশেষ করে ডিম্পল বা কাফ মাসল) তীব্র ব্যথা বা খিঁচুনি হওয়া, যা কয়েক মিনিট বিশ্রাম নিলে সেরে যায়।

  • পায়ের তাপমাত্রা ও রঙের পরিবর্তন: এক পা অন্য পায়ের চেয়ে বেশি ঠান্ডা মনে হওয়া এবং পায়ের চামড়া নীলচে বা ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া।

  • ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া: পায়ে বা আঙুলে কোনো ছোট ক্ষত বা আলসার হলে তা সহজে না শুকানো।

  • পায়ের লোম ও নখের পরিবর্তন: পায়ের পাতার লোম ঝরে যাওয়া এবং নখের বৃদ্ধি মন্থর হয়ে যাওয়া।

  • নাড়ির স্পন্দন কমে যাওয়া: পায়ে বা গোড়ালিতে হাতের স্পর্শে পালস বা নাড়ির গতি খুব ক্ষীণ অনুভব করা।

কেন হয় এই রোগ? (ঝুঁকির কারণসমূহ)

১. ধূমপান: PAD হওয়ার এক নম্বর কারণ হলো তামাক। এটি ধমনীর দেয়ালকে শক্ত ও সংকুচিত করে দেয়।

২. ডায়াবেটিস: রক্তে উচ্চ শর্করার কারণে রক্তনালীর ভেতরের আস্তরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

৩. উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল: ধমনীর ভেতরে চর্বি বা প্লাক জমতে (Atherosclerosis) সাহায্য করে।

৪. বয়স ও স্থূলতা: সাধারণত ৫০ বছরের বেশি বয়সী এবং অতিরিক্ত ওজনের ব্যক্তিদের ঝুঁকি বেশি।

‘সেডেন্টারি ডেথ সিন্ড্রোম’ ও PAD

সাম্প্রতিক কার্ডিওভাসকুলার গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন টানা ৬ ঘণ্টার বেশি বসে কাজ করেন, তাদের শরীরে রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হয় এবং ধমনীতে প্রদাহ (Inflammation) বাড়ে। নতুন এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, নিয়মিত ‘ইন্টারভাল ওয়াকিং’ (কিছুক্ষণ দ্রুত হাঁটা এবং কিছুক্ষণ বিশ্রাম) সাধারণ হাঁটার চেয়ে PAD রোগীদের ধমনীর নমনীয়তা বাড়াতে বেশি কার্যকর। এছাড়াও, রক্তে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের অভাব এই রোগের ঝুঁকি ত্বরান্বিত করতে পারে।

চিকিৎসা ও প্রতিরোধে আধুনিক উপায়

PAD ম্যানেজমেন্টের প্রধান লক্ষ্য হলো রক্ত সঞ্চালন বাড়ানো এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমানো:

  • সুপারভাইজড এক্সারসাইজ: নিয়মিত ব্যায়াম রক্তনালীর নতুন শাখা তৈরি করতে সাহায্য করে, যাকে বলা হয় ‘ন্যাচারাল বাইপাস’।

  • ওষুধ: রক্ত পাতলা করার ওষুধ (Antiplatelets) এবং কোলেস্টেরল কমানোর স্ট্যাটিন জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা হয়।

  • অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি ও স্টেন্টিং: যদি ধমনী মারাত্মকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তবে ক্যাথেটারের সাহায্যে বেলুন ফুলিয়ে বা স্টেন্ট বসিয়ে রক্ত চলাচলের পথ বড় করা হয়।

  • ব্যান্ডেড সার্জারি: গুরুতর ক্ষেত্রে শরীরের অন্য অংশ থেকে রক্তনালী নিয়ে বাইপাস সার্জারি করা হয়।

জীবনযাত্রায় যা পরিবর্তন আনা জরুরি

  • ধূমপান সম্পূর্ণ ত্যাগ: এটি ছাড়া অন্য কোনো চিকিৎসা কার্যকর হবে না।

  • পায়ের যত্ন: নিয়মিত পা পরিষ্কার রাখা এবং আরামদায়ক জুতো পরা যাতে কোনো ক্ষত না হয়।

  • খাদ্যাভ্যাস: প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল এবং ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার (যেমন সামুদ্রিক মাছ বা তিসির তেল) ডায়েটে রাখা।

বিশেষ পরামর্শ: যদি বিশ্রামের সময়ও পায়ে তীব্র ব্যথা হয় বা পায়ের আঙুল কালো হয়ে যায়, তবে এটি একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি। একে ‘ক্রিটিকাল লিম্ব ইসকেমিয়া’ বলা হয়, যা দ্রুত চিকিৎসা না করলে অঙ্গহানি ঘটাতে পারে।

Leave A Comment